
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত ১০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ৩ জন, গাজীপুরে ১ জন, নারায়ণগঞ্জে ১ জন এবং সবচেয়ে বেশি ৫ জন নরসিংদীতে প্রাণ হারিয়েছেন। এ ঘটনায় সারাদেশে সাড়ে চারশর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ এবং এর উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকা। মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এই কম্পনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভবনে ফাটল দেখা দেয় এবং বৈদ্যুতিক, শিল্প ও সরকারি স্থাপনাসহ বহু স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি হয়।
নরসিংদীতে বাবা-ছেলেসহ পাঁচজনের মৃত্যু
নরসিংদীতে ভূমিকম্পটি সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটিয়েছে। জেলার তিনটি উপজেলায় বাবা-ছেলেসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতরা হলেন—
হোসেন (৩৭) ও তার শিশু ছেলে ওমর ফারুক (১০), গাবতলী, নরসিংদী সদর
কাজম আলী ভূইয়া (৭০), পলাশ
নাসির উদ্দিন (৫০), ডাঙ্গা, পলাশ
ফুরকান মিয়া (৪০), আসকিতলা, শিবপুর
ভূমিকম্পে এসব এলাকার ঘর-বাড়ি ও স্থাপনা ধসে পড়া এবং দেয়ালচাপা পড়েই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। নরসিংদী জেলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আহত শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শিল্প স্থাপনাগুলোতেও বড় ধরনের ক্ষতি
নরসিংদীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ঘোড়াশাল ও পলাশ এলাকায় ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
ঘোড়াশাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি সাবস্টেশনে অগ্নিকাণ্ড ঘটে, যা ফায়ার সার্ভিস দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে। ভূমিকম্পের কারণে সাবস্টেশনের একাধিক প্রোডাকশন ট্রান্সফরমার ভেঙে পড়ে।
ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। ভূমিকম্পের সময় উৎপাদনমুখী মেশিনারিজ তীব্র কম্পনে বন্ধ হয়ে যায় এবং বর্তমানে কারিগরি বিশেষজ্ঞরা সার্বিক যান্ত্রিক অবস্থা পরীক্ষা করছেন।
সরকারি ভবনেও ফাটল – সর্বোচ্চ সতর্কতা
ভূমিকম্পের পর নরসিংদী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, সার্কিট হাউসসহ অন্তত শতাধিক ভবনে ফাটলের খবর পাওয়া গেছে। অনেক স্থাপনায় দৃশ্যমান ক্ষতির বাইরে কাঠামোগত দুর্বলতার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
পরিস্থিতি সমন্বয়ের জন্য জেলা প্রশাসন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কন্ট্রোল রুম চালু করেছে। সেখানে প্রতিটি উপজেলা ও সরকারি সংস্থার সাথে সরাসরি যোগাযোগ রেখে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ ও ত্রাণ-সহায়তার নজরদারি করা হচ্ছে।
আতঙ্কে মানুষ রাস্তায়
ভূমিকম্পের তীব্রতায় নরসিংদীসহ দেশের বহু এলাকায় মানুষ ঘরবাড়ি, বাজার ও অফিস থেকে ছুটে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসে। বহু এলাকায় এখনো ধ্বংসস্তূপ সরানো, ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিতকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন বিচ্ছিন্ন করার কাজ চলছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
জ্যেষ্ঠ ভূকম্পবিদদের মতে, নরসিংদীর নিচ দিয়ে সক্রিয় ফল্ট লাইন থাকায় এই অঞ্চলে হঠাৎ শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। উৎপত্তিস্থল জনবসতিপূর্ণ এলাকায় হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে বলে তারা মন্তব্য করেছেন।
উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চলছে
ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, সিভিল সার্জন অফিস, পল্লী বিদ্যুৎ, শিল্প কারখানার পৃথক টিম ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা চিহ্নিতের কাজ পরিচালনা করছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :