
আজ ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতার দিন। দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। দীর্ঘ দিন শারীরিক অসুস্থতার পর ভোর সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন, মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
🔹 রাজনৈতিক জীবন: গৃহবধূ থেকে দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বে
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্মগ্রহণ করেন। সাধারণ জীবন থেকেই রাজনীতিতে প্রবেশ তাঁর জীবন-গল্পটি অসাধারণ। ১৯৮১ সালে স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর তিনি বিএনপি-র বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন এবং দলের নেতা হিসেবে দ্রুত উন্নতি করেন।
১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারি ২৭-এ অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়া করেন। তার নেতৃত্বে সংসদে ১২তম সংশোধনী বিল পাশ হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে আবারো সংসদীয় গণতন্ত্র পুনর্বহাল করা হয়।
খালেদা জিয়া মোট তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন — তাঁর প্রথম মেয়াদকাল শুরু হয় ১৯৯১-তে, আর পরবর্তী পরিবেশে ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত তিনি আবার দেশ চালিয়েছেন।
🔹 সরকারী নীতি ও উন্নয়নমূলক উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে খালেদা জিয়া শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেন। তাঁর সরকারের সময় প্রাথমিক শিক্ষা বিনামূল্যে ঘোষণাসহ নারী শিক্ষার প্রসার এবং অর্থনৈতিক বৃদ্ধি-মুখী নীতিতে জোর দেওয়া হয়। employment ও রপ্তানি-উৎপাদন খাতে উন্নয়ন ঘটানোর মতো উদ্যোগও দেখা গেছে।
🔹 রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সমালোচনা
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিশেষত শেখ হাসিনা-র সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যোগ্যতার কারণে তাদের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বটি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে আন্তর্জাতিকভাবে ‘Battle of the Begums’ নামে পরিচিতি পায়।
রাজনৈতিক জীবনে তিনি যেমন সমর্থন পেয়েছেন, তেমনি বিতর্ক ও আইনি চ্যালেঞ্জেও মোকাবিলা করেছেন। ২০১৮ সালে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে কারাবন্দি করা হলেও সমালোচকরা সেই সময়ে এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন।
🔹 মৃত্যু ও শোক প্রতিক্রিয়া
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশজুড়ে গভীর শোক ও দুঃখের ছায়া নেমে এসেছে। বাংলাদেশের সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে এবং সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ মানুষ শোকবার্তা প্রকাশ করেছেন। ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি তাঁর অবদানের জন্য শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
🔹 আন্তর্জাতিক প্রভাব ও স্বীকৃতি
খালেদা জিয়ার মৃত্যু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও গুরুত্ব পেয়েছে। বিভিন্ন দেশের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর দেশ-প্রেম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
উপসংহার: ইতিহাসে খালেদা জিয়ার স্থান
বেগম খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না — তিনি গণতন্ত্র, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দেশ পরিচালনার এক শক্তিশালী নিদর্শন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ সময়কার ভূমিকা মনে রাখা হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তিনি এক অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে থাকবেন।
আপনার মতামত লিখুন :