
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা, দুর্বল ব্যাংক খাত, বড় রাজস্ব ঘাটতি ও ক্রমবর্ধমান ঋণ পরিশোধের চাপের মতো কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছে বর্তমান সরকার। গত ছয় মাসে এই কাঠামোগত সমস্যাগুলোর পুরোপুরি সমাধান না হলেও ডলারের বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, প্রবাসী আয় ও রপ্তানি খাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। জুলাই মাসে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি। বিদায়ী ২০২৫–২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে অন্তত দুই বছর সময় প্রয়োজন। সরকার এরই মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, পুঁজিবাজার সংস্কার এবং ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃ অর্থায়ন কর্মসূচিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের তালিকা প্রকাশ করেছে। ব্যবসার অপ্রয়োজনীয় বাধা দূর করতে ১০ আগস্ট একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে একাধিকবার বৈঠক করেছেন, যার ফলে ১৪টি শিল্পগোষ্ঠী রাষ্ট্রমালিকানাধীন বন্ধ কারখানায় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এখনো স্থবিরতা কাটেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, জিডিপির অনুপাতে বেসরকারি বিনিয়োগ গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, যা বর্তমানে ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য–উপাত্ত বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। এছাড়া মধ্যবর্তী পণ্যে সাড়ে ৬ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামালে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ কমেছে। কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা দশ বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে প্রায় ৯ লাখে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নতুন শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, যা উৎপাদন ব্যাহত করছে।
ব্যাংক খাতের অবস্থাও বেশ নাজুক। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ শতাংশ। সরকার ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন পাস করেছে, তবে এতে দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের ফিরে আসার সুযোগ রাখা নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় বিতর্কিত ধারাটি বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ১০টি বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, কর ফাঁকি ও অর্থ পাচারের তদন্ত অব্যাহত রেখেছে সরকার। পাশাপাশি ২০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে এমন ৪২টি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে অর্থ পাচার হয়েছে কি না, তা তদন্ত করতে আটটি বিদেশি সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ২১ মাস পর গত ৩০ জুলাই কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে আনলেও ব্যাংক ঋণের সুদ দ্রুত কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরীর মতে, ব্যাংক খাতের আস্থাহীনতা এবং জ্বালানিসংকট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছে। ১২ আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ৩ হাজার ২২৬ কোটি ডলার এবং মোট রিজার্ভ ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ডলারের দামও ১২৩ থেকে ১২৪ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। তবে জুন ও জুলাই মাসে প্রবাসী আয় ৩০০ কোটি ডলারের নিচে নেমে আসায় উদ্বেগের কারণ রয়ে গেছে। একই সঙ্গে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, কর্ণফুলী টানেল ও মেট্রোরেল প্রকল্পের মতো বড় প্রকল্পগুলোর ঋণ পরিশোধের চাপ আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিদায়ী অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ মিলিয়ে বাংলাদেশ ৪৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে, যা এযাবৎকালের সর্বোচ্চ।
আপনার মতামত লিখুন :