
ভবিষ্যতের মহাকাশে অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে রোবট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং উন্নত ডিজিটাল ইমেজিং প্রযুক্তি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে। বৃটেনের নর্থাম্ব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী ও ফৌজদারি আইনজীবী ড. মেহযেব চৌধুরীর দীর্ঘ গবেষণায় উঠে এসেছে যে, মহাকাশে সংঘটিত খুনের মতো অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে এসব প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। ১৯৮০ সাল থেকে মহাকাশে মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে। ভবিষ্যতে মহাকাশে মানুষের উপস্থিতি ও স্থায়ী বসবাস বাড়লে সেখানে অপরাধের ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে, যা তদন্ত করা পৃথিবীর প্রচলিত পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
ড. মেহযেব চৌধুরী ২০১৬ সালে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার সময় 'ম্যাবম্যাট' নামক একটি রোবট উদ্ভাবন করেছিলেন। এই রোবট অপরাধস্থলের ৩৬০ ডিগ্রি ছবি ও ভিডিও ধারণে সক্ষম, যা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে পৃথিবীতে বসে তদন্তকারীদের সাহায্য করতে পারে। ভবিষ্যতে এমন রোবটে উচ্চ-রেজ্যুলুশনের ত্রিমাত্রিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার এবং হাইপারস্পেকট্রাল ইমেজিং যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা খালি চোখে অদৃশ্য প্রমাণও শনাক্ত করতে পারবে।
মহাকাশে অপরাধ তদন্তের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো মাইক্রোগ্র্যাভিটি বা অতি স্বল্প মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশ। যুক্তরাষ্ট্রের রোজওয়েল পুলিশ বিভাগের ফরেনসিক গোয়েন্দা জ্যাক কোয়ালস্কে এবং ইউনিভার্সিটি অব লুইসভিলের ড. জর্জ প্যান্টালোস 'ভমিট কমেট' নামক বিশেষ বিমানের মাধ্যমে মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে রক্তের আচরণ নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণাটি ৫ থেকে ৬ জন গবেষকের উপস্থিতিতে পরিচালিত হয়। কোয়ালস্কে জানান, মাইক্রোগ্র্যাভিটির পরপরই বিমানটি দ্বিগুণ মাধ্যাকর্ষণের (২জি) অবস্থায় প্রবেশ করে। ফলে তৈরি হওয়া রক্তের দাগ সঙ্গে সঙ্গেই পরিবর্তিত হয়ে যায় এবং পরীক্ষার ফল আংশিকভাবে নষ্ট হয়। এই প্রক্রিয়ায় ২০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ২ বার মাধ্যাকর্ষণ পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হয়। পৃথিবীতে রক্ত যে গতিপথ ও প্যাটার্ন অনুসরণ করে, মহাকাশে সারফেস টেনশন বা পৃষ্ঠটানের কারণে তার আচরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। ফলে অপরাধের উৎস শনাক্ত করা গোয়েন্দাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
খুনের অস্ত্র বা গুলির প্রমাণ শনাক্তের ক্ষেত্রেও নতুন কৌশলের প্রয়োজন হবে। ফরেনসিক ব্যালিস্টিকস বিশেষজ্ঞ ড. ক্রিস শেফার্ডের মতে, মহাকাশে গুলি চালানো হলে গানশট রেসিড্যু বা রাসায়নিক কণা বাতাসে ভেসে থাকে এবং বায়ু চলাচল ব্যবস্থার ফিল্টারে আটকে যায়। এই ফিল্টার পরীক্ষার মাধ্যমে গুলির ধরন ও অস্ত্রের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। তবে মহাকাশে অপরাধের তদন্ত শুধু রক্তের দাগ বা গুলির খোলসেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং নতুন করে ফরেনসিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য আজ থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা।
আপনার মতামত লিখুন :