
আজ সকালে সারা দেশের লাখো পরিবারে একই সঙ্গে বেজে উঠেছে আনন্দ আর বেদনার ভিন্ন দুটি সুর। প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল। কোনো বাড়িতে মিষ্টি বিতরণ চলছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে যাচ্ছে জিপিএ-৫ পাওয়ার উচ্ছ্বাস। অন্যদিকে কোনো বাড়িতে নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা—দরজা বন্ধ করে একাকী কাঁদছে কোনো এক কিশোর বা কিশোরী, যার নামের পাশে হয়তো কাঙ্ক্ষিত ফলটি আসেনি।
এবারের ফলাফল আমাদের শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাইকে গভীরভাবে থমকে দিয়েছে। পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ—যা গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩৮ জনই এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ১ লাখ ১৬ হাজারের কিছু বেশি, যা বিগত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। খাতা মূল্যায়ন ও তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, মূলধারার দুটি বিষয়—ইংরেজি ও গণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়াই সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়ার পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
বাস্তবতার এই চোখরাঙানি আমাদের সামনে দুটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রথমত, যারা সফল হয়েছে, তাদের আমরা কীভাবে ভবিষ্যতে এগিয়ে নিয়ে যাব? দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—যারা এই যাত্রায় সফল হতে পারেনি, তাদের পাশে সমাজ ও অভিভাবক হিসেবে আমরা কীভাবে দাঁড়াব?
যারা প্রত্যাশিত ফল অর্জন করেছ, তাদের আন্তরিক অভিনন্দন। এই সাফল্য পরিশ্রম, মা-বাবার ত্যাগ এবং শিক্ষকদের নিষ্ঠার এক সুন্দর সম্মিলন। তবে মনে রাখা জরুরি, এসএসসি জীবনের গন্তব্য নয়—এটি কেবল দীর্ঘ এক যাত্রার শুরু মাত্র। জিপিএ-৫ পাওয়া মানেই যেমন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়ে যাওয়া নয়, তেমনি কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া মানেও সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। সামনে উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার যে নতুন ধাপগুলো রয়েছে, সেখানে সফল হতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন শেখার আগ্রহ, শৃঙ্খলা এবং বিনয়। আজকের অর্জন যেন কোনোভাবেই আত্মতুষ্টি সৃষ্টি না করে, বরং তা যেন আরও বড় স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।
আর যারা এবার অকৃতকার্য হয়েছ কিংবা প্রত্যাশিত ফল পাওনি, তাদের স্পষ্ট করে বলছি—একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে কোনো মানুষের মেধা, সম্ভাবনা কিংবা জীবনের মূল্য নির্ধারিত হতে পারে না। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে জীবনের শুরুতে বড় বড় হোঁচট খাওয়া মানুষগুলোই পরবর্তীতে সফলতার শীর্ষ ছুঁয়েছেন। আজকের এই ক্ষোভ আর কষ্টকে শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। ভুলগুলো চিহ্নিত করে বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি শক্ত করার জন্য এই সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে, থেমে যাওয়াতেই ব্যর্থতা, আবার চেষ্টা করার মধ্যে নয়।
এই সময়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করতে হবে অভিভাবকদের। যে সন্তানটি আজকে ফল খারাপ করেছে, এই মুহূর্তে পরিবার ও বাবা-মাকে তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। অন্য কারও সঙ্গে তুলনা কিংবা মানসিক তিরস্কার একটি কিশোর মনকে কতটা বিপন্ন করে তুলতে পারে, তা আমরা প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা থেকে বুঝতে পারি। আজ আপনার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরুন। তাকে বিশ্বাস বানান—কোনো কাগজের নম্বরের চেয়ে তার জীবন ও উপস্থিতি আপনার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।
একইসঙ্গে এবারের ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গলদগুলোকেও নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে। যখন একটি দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মৌলিক দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়, তখন বুঝতে হবে দায় কেবল শিক্ষার্থীর একার নয়। এটি মূলত শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, গ্রাম ও শহরের শিক্ষা বৈষম্য এবং মুখস্থনির্ভর ব্যবস্থারই ব্যর্থতা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দীর্ঘ দিন কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি দুর্বল থেকে গেলে উচ্চশিক্ষার প্রতিটি ধাপে শিক্ষার্থীদের প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এখনই। জীবন কোনো এক দিনের মার্কশিট বা ৩ ঘণ্টার পরীক্ষার ফল নয়; জীবন এক দীর্ঘ ম্যারাথন। আজকের এই ফলাফলে যারা হেসেছ, তারা যেমন এই দেশের ভবিষ্যৎ, ঠিক তেমনি যারা আজ হোঁচট খেয়ে কাল আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে, তারাও এই দেশের সমান অংশীদার। জীবনের এই দীর্ঘ পথচলায় আমরা যেন কাউকে পেছনে ফেলে না যাই।
আপনার মতামত লিখুন :