
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫ শতাংশ পরিবার স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে, যার অর্থ প্রায় ১৫ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। ডিজিটাল দুনিয়ার এই প্রসারের ফলে জীবন সহজ হওয়ার পাশাপাশি সাইবার অপরাধ, গুজব, অপতথ্য এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ঝুঁকিও বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি যথাযথ আইনের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও, প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনী নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক প্ল্যাটফর্ম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সতর্ক করেছে যে, এই খসড়া পাস হলে সাইবার জগৎ নিপীড়নের ভুবনে পরিণত হতে পারে। বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার মিডিয়া দমন ও দুর্নীতি আড়াল করতে এই সংশোধনী আনছে।
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) প্রস্তাবিত সংশোধনীর বেশ কিছু ধারা নিয়ে তাদের উৎকণ্ঠা ও আপত্তি জানিয়েছে। সবচেয়ে বিতর্কিত ২৬ক ধারা অনুযায়ী, গুজব বা অপতথ্য প্রচার করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। বিজেসি প্রশ্ন তুলেছে, তাৎক্ষণিক ও দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘটনার ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ভীতির মুখে পড়বে। এছাড়া, অযাচাইকৃত তথ্য মানেই সবসময় মিথ্যা তথ্য নয় বলে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে।
বর্তমান আইনের ২৫ ধারায় মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন করার বিষয়টি যুক্ত করার প্রস্তাবকেও বিজেসি অযৌক্তিক বলে মনে করে। তাদের মতে, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল বা রিভেঞ্জ পর্নোর মতো গুরুতর অপরাধের সাথে মানহানিকে একই কাতারে রাখা হলে তা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ব্যবহৃত হতে পারে। দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারার সাথে সাংঘর্ষিক এই শাস্তির মাত্রা (৫ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লক্ষ টাকা) আইনের সমানাধিকার নীতির পরিপন্থী। এছাড়া, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কোনো নীতিমালা না থাকায় এই আইনটি অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করবে।
সংশোধনীতে কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে সরকারের একচ্ছত্র ক্ষমতা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানকে কোম্পানির আওতায় এনে লাইসেন্স বাতিলের সুযোগ রাখা নিয়ে বিজেসি শঙ্কা প্রকাশ করেছে। বিদ্যমান আইনের চেয়েও কঠোর এই বিধান গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকি। এছাড়া, ২৯ সদস্যের সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে বাদ দেওয়া এবং গণমাধ্যমের কোনো প্রতিনিধি না রাখায় স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি কর্মকর্তাদের 'সরল বিশ্বাসে' কাজের দায়মুক্তি থাকলেও নাগরিকদের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বিজেসি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দিয়েছে: ২৬ক ধারা পুনর্বিবেচনা করে ফ্যাক্ট-চেকিং ও সাংবাদিকতায় জোর দেওয়া, নারী ও শিশু সুরক্ষার ধারা থেকে মানহানি ও হেয় প্রতিপন্ন করার অংশ বাদ দেওয়া, কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষেত্রে লিখিত কারণ ও বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে অংশীজনদের সাথে অর্থবহ আলোচনা করা।
আপনার মতামত লিখুন :