
এক প্রজন্মের ব্যবধানেই পুতিজাম এখন প্রায় অচেনা এক ফলে পরিণত হয়েছে। অথচ কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের বিল ও জলাভূমির ধারে এই ফলটি ছিল অত্যন্ত সহজলভ্য। হিজল, করচ, জারুল, কদম বা চালতার মতোই নিচু জমিতে পুতিজাম গাছ লাগানো হতো, কারণ এই গাছগুলোর শিকড় পানিতে ডুবে থাকলেও টিকে থাকতে পারে। সব গাছ এই প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে না।
পুতিজামের এই হারিয়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ হলো জলাভূমি বা বিল ভরাট হয়ে যাওয়া। গত চার দশকে ঢাকার আশপাশের বেলাই, শালদহ ও লবণধলার মতো বড় বড় বিলসহ দেশের অনেক জলাভূমি ভরাট করে রাস্তা বা বসতবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। জলাভূমি কমে যাওয়ার ফলে যেমন মাছ ও পাখি তাদের আবাসস্থল হারিয়েছে, তেমনি হারিয়ে যাচ্ছে হিজল, করচ ও পুতিজামের মতো গাছগুলো। এদের অস্তিত্ব সম্পূর্ণভাবে সেই ভেজা মাটির ওপর নির্ভরশীল ছিল।
বুনো ফলের জগতে পুতিজামের নাম-বৈচিত্র্য গ্রামবাংলার এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। একে কোনো এলাকায় বুটিজাম বলা হয়, আবার চাকমা বা মারমা জনগোষ্ঠীর ভাষায় এর নাম সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলটির বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium fruticosum, যা জামের (Syzygium cumini) একই Myrtaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। গাছটি ১০ থেকে ১২ মিটার লম্বা হয় এবং এর পাতাগুলো লম্বাটে ও চকচকে। চৈত্র-বৈশাখে এতে ছোট সাদা ফুল ফোটে এবং জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে মটর দানার মতো ছোট ফল ধরে, যা পাকলে কালো বা বেগুনি রঙ ধারণ করে।
বাঘ বা বড় কোনো প্রাণীর মতো পুতিজামের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে সেভাবে প্রচারণা বা প্রতিবাদ দেখা যায় না। ইন্টারনেটে বা গুগলে এই ফল সম্পর্কে খুব কম তথ্য বা ছবি পাওয়া যায়। তবে আশার কথা হলো, পরিবেশকর্মীরা এখন বিল ও জলাভূমি বাঁচানোর ব্যাপারে সোচ্চার হচ্ছেন। বিল বাঁচলে মাছ ও পাখির পাশাপাশি পুতিজামের মতো গাছগুলোও টিকে থাকার সুযোগ পাবে। এখনো আমাদের গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা মা-বাবাদের স্মৃতিতে এই ফলটি জীবন্ত হয়ে আছে, যা তাঁদের কাছে কৈশোরের স্কুল পালানো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
আপনার মতামত লিখুন :