Facebook Twitter Instagram YouTube

নদী রক্ষায় জাতীয় কমিশনের ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন জরুরি


প্রকাশের সময় : জুলাই ১০, ২০২৬, ১২:২২ অপরাহ্ণ /
নদী রক্ষায় জাতীয় কমিশনের ক্ষমতা ও স্বায়ত্তশাসন জরুরি

নদী দখলকারী, দূষণকারী এবং তাদের সহায়তাকারী কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে একটি স্বাধীন ও সক্ষম সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা অপরিহার্য। বর্তমান আইন ও প্রস্তাবিত খসড়া আইনের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং রিভারাইন পিপলের পরিচালক তুহিন ওয়াদুদ এই দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, কমিশনের কার্যকর ক্ষমতা না থাকলে নদী উদ্ধার ও অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া সম্ভব নয়, ফলে অবৈধ দখলদার ও দূষণকারীরা কমিশনকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে না।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০১৩-এর সীমাবদ্ধতার কারণে কমিশন নদী সুরক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এমনকি উচ্চ আদালতও কমিশনকে শক্তিশালী করার নির্দেশনা দিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২৬ (খসড়া) প্রস্তুত করেছে, যা বর্তমানে চূড়ান্তকরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

প্রকৃতপক্ষে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ যদি সঠিকভাবে পালন করা হতো, তাহলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের হয়তো প্রয়োজনই হতো না। এই আইনের ক্ষমতাবলে ডেপুটি কালেক্টররা (জেলা প্রশাসক) নদী রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে বহুবিধ কাজের চাপে তারা নদীর প্রতি যত্নশীল হওয়ার সুযোগ পান না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের হাত ধরেই নদীগুলোর সর্বনাশ হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ২০১৩ সালে উচ্চ আদালতের ৩৫০৩/২০০৯ নং রিট পিটিশনের রায়ে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।

২০১৩ সালের আইনে কমিশনকে প্রায় ক্ষমতাহীন করে তৈরি করা হয়েছে। এর আইন প্রয়োগের কোনো ক্ষমতা নেই; কমিশনের ১২ ধারায় কেবল ১৩টি বিষয়ে সুপারিশ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমলে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৮-এ আইনের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘নদীর জমির অবৈধ দখল, পুনর্দখল, নদীর পানি ও পরিবেশদূষণ ঘটলে বা ঘটালে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধকরণার্থে কোনো দায়িত্ব কমিশনকে দেওয়া হয়নি।’ উদাহরণস্বরূপ, কমিশন একটি নদী রক্ষার জন্য কয়েকবার চিঠি দিলেও জেলা-উপজেলা প্রশাসন কোনো ভ্রুক্ষেপ করেনি। তদন্ত প্রতিবেদন ও ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার পরও কাজ না হওয়ায় কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তাতেও কোনো ফল আসেনি।

কমিশনের এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চ আদালত ১৩৯৮৯/২০১৯ নং রিট পিটিশনের রায়ে নদীকে ‘আইনগত সত্তা’ এবং জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর ‘আইনি অভিভাবক’ ঘোষণা করেছেন। আদালত বাংলাদেশের নদীগুলোকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করে কমিশনকে কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনের নির্দেশনা দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ (খসড়া) প্রস্তুত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রেরণ করে, কিন্তু সেটি কেন আইনে পরিণত হয়নি, তা অজানা। এই খসড়া আইনে সবকিছু সবিস্তারে উল্লেখ ছিল।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২৬ (খসড়া) প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এই খসড়া আইনে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা চূড়ান্ত করার আগে ভেবে দেখা জরুরি।

প্রথমত, ‘নদী’ সংজ্ঞায়নে ত্রুটি রয়েছে। সরকারিভাবে নদীর কোনো সংজ্ঞা আগে ছিল না। ২০২৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন একটি সংজ্ঞা চূড়ান্ত করে, যা নিয়ে নদীবোদ্ধাদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিতর্কিত এই সংজ্ঞাটির মূলভাব ঠিক রেখে দু-একটি শব্দের পরিবর্তন করে তা খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, একটি বিল থেকে অন্য একটি বিলে বয়ে যাওয়া প্রবাহকেও নদী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তবে কমিশনের ২০২৩ সালের সংজ্ঞায় সিএস, এসএ এবং বিএস রেকর্ডে যা নদী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাও নদী—এই অংশটুকু খসড়া আইনে অনুপস্থিত।

দ্বিতীয়ত, খাল সম্পর্কে অস্পষ্টতা রয়েছে। খসড়া আইনের ৩ ধারার (ব) অংশে বলা হয়েছে, ‘খাল বলিতে পানির অন্তঃপ্রবাহ বা বহিঃপ্রবাহের পথকে বুঝাইবে।’ এই কয়েকটি শব্দ দিয়ে খাল চিহ্নিত করা যায় না এবং বাক্যটি স্পষ্ট নয়।

তৃতীয়ত, জলাশয় অন্তর্ভুক্ত না থাকলে বড় ধরনের অসুবিধা হবে। ২০১৩ সালের আইনে নদী-খাল-বিল-জলাশয় সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত ছিল, কিন্তু ২০২৬ সালের খসড়া আইনে জলাশয়কে বাদ দেওয়া হয়েছে। দেশের অনেক নদী জলাশয় থেকে উৎপন্ন হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন জলাশয়গুলো লিজ দেয়, যা ক্ষেত্রবিশেষে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশি করে। লিজগ্রহীতারা যদি নদীর সঙ্গে বিলকে বিচ্ছিন্ন করে মাছ চাষ করে, তাহলে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইনগতভাবে কিছুই করতে পারবে না। ব্রিটিশ আমলে নদীর ভেতরের প্রশস্ত ও গভীর অংশটুকু বিল-জলাশয় হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। খসড়া আইনে জলাশয় না থাকলে নদীর মধ্যবর্তী বিলগুলো দখল বা ব্যক্তিগত নামে লিখে নিলে কমিশনের আইনগতভাবে বলার কিছু থাকবে না। অথচ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২০ (খসড়া) আইনে জলাশয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

চতুর্থত, শাস্তির পদ্ধতি ও ধরন স্পষ্ট নয়। অবৈধ দখলদারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও, যে কর্মকর্তা এসব জমি ব্যক্তির নামে লিখে দেন, তাদের শাস্তির বিধান স্পষ্ট হয়নি। সাধারণ অপরাধীর শাস্তির বিধান রাখা হলেও সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার শাস্তির ক্ষেত্রে বিভাগীয় মামলা হবে কি না, তা উল্লেখ থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন কর্মকর্তা যদি সরকারের ১০০ কোটি টাকা মূল্যমানের জমি ব্যক্তিকে লিখে দেন, তাহলে তার শাস্তির বিধান স্পষ্ট নয়। যার নামে লিখে দেওয়া হবে, তার সর্বোচ্চ শাস্তি হবে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা ১৫ বছরের জেল বা উভয়টি, যা দখলভেদে আরও বেশি হওয়া প্রয়োজন। নদী দখল ও নদীর জমি ব্যক্তিগত নামে লেখার সঙ্গে জড়িত সবাইকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

পঞ্চমত, সরকারি প্রতিষ্ঠান নদীর ক্ষতি করলে প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা আইনে রাখা হয়নি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বগুড়ার করতোয়া, নাটোরের বড়াল, পাবনার ইছামতীকে প্রায় মেরে ফেলেছে এবং তিস্তার অন্তত ১০টি শাখা নদী মেরেছে। পাউবোসহ বরেন্দ্র, বিএডিসি, এলজিইডি, মৎস্য বিভাগ অনেক নদীকে খননের নামে সংকুচিত করেছে। এলজিইডি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তারা নদীর চেয়ে অনেক ছোট সেতু তৈরি করে নদীর চরম সর্বনাশ করে চলছে। অনেক স্থানে সেতু ছাড়া নদীর ওপর আড়াআড়ি রাস্তা নির্মাণ করেছে। এসব সংস্থা কি আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে? প্রস্তাবিত খসড়া আইনে এসব বিষয় স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে।

ষষ্ঠত, বিভাগীয় কার্যালয় ও নদী আদালত প্রতিষ্ঠায় বাধ্যবাধকতা নেই। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন ২০২০ (খসড়া)-এ বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যালয় এবং আদালত প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। নতুন প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, কমিশন চাইলে জেলা পর্যায়ে আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারবে এবং প্রয়োজনে বিভাগীয় কিংবা জেলা কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করা যাবে। বাস্তবে, বিভাগীয় পর্যায়ে কমিশনের কার্যালয় এবং আদালত দুটোই খুব প্রয়োজন এবং আইনে প্রতিষ্ঠার বাধ্যবাধকতা রাখা উচিত।

সপ্তমত, কমিশনের ম্যাজিস্ট্রেসি প্রয়োগের ক্ষমতা নেই। খসড়া আইনের ১২ ধারায় কমিশনের কার্যাবলি অংশে দখল-দূষণমুক্ত করার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ ও উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলা হলেও, কমিশনের যদি ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা না থাকে, তাহলে নদী দখলমুক্ত করতে পারবে না।

অষ্টমত, কমিশনের নির্দেশনা পালন না করলে কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। প্রস্তাবিত খসড়া আইনের ১৩ ধারায় বলা হয়েছে, ১২ ধারা মোতাবেক দেওয়া নির্দেশনা ও পরামর্শ নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর বাস্তবায়ন করতে না পারলে যুক্তিসংগত জবাব দিতে হবে। কিন্তু তারা যদি তা না করে, তাহলে কী হবে তা বলা নেই। বাস্তবে, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের অসংখ্য নির্দেশনা জেলা প্রশাসক কিংবা ইউএনওরা পালন করেন না। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের নির্দেশনা পালন না করলে কী হবে, সেই বিষয়টি অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে।

সরেজমিন বিশদ অভিজ্ঞতা ছাড়া নদীবিষয়ক বাস্তবতা বোঝা কঠিন। যাদের কাঁধে নদী সুরক্ষার দায়িত্ব দেওয়া আছে, তাদেরও অনেকে নদীর প্রকৃত সংকট বোঝেন না বলেই মনে হয়। ১৬ বছর ধরে নদী সুরক্ষায় মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক সংকট দেখেছেন লেখক। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে এমন স্বাধীন ও সক্ষম সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হতে হবে, যাতে কমিশন সক্ষমতা দিয়ে নদী উদ্ধার করতে পারে এবং অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারে। তাহলেই কমিশনকে অবৈধ দূষণকারী, দখলকারী ও দখল-দূষণে সহায়তাকারী কর্মকর্তা সবাই গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবে। আইন বারবার সংশোধন করা কঠিন, তাই যেহেতু আইন সংশোধন করা হচ্ছে, এটি এমন একটি আইন হওয়া উচিত যা সত্যিই নদী সুরক্ষা দেবে।

খসড়া আইনে এই অংশটুকু নেই।.তালিকায় ১ হাজার ৪১৫ নদী, এবার কি বাঁচবে.খাল সম্পর্কে অস্পষ্টতাখসড়া আইনে খাল সম্পর্কে খুবই অস্পষ্ট ধারণা দেওয়া হয়েছে।