
ইসলাম ধর্মে মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন, জানাজা এবং দাফন প্রক্রিয়াকে যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন হাদিসে মৃত্যুর পর দাফন পর্যন্ত এই কাজগুলো বিলম্ব করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
হজরত মুহাম্মদ (সা.) তালহা ইবনে বারা (রা.)-কে অসুস্থ অবস্থায় দেখতে গিয়ে বলেছিলেন, “আমি তালহার মধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখতে পাচ্ছি। সে মারা গেলে আমাকে জানাবে। তোমরা দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। কেননা, কোনো মুসলমানের লাশকে পরিবারের লোকদের মাঝে আটকে রাখা উচিত নয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩১৫৯)। একইভাবে, আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তোমরা তাকে আটকে রেখ না। তাকে দ্রুত দাফন করে দিও।” (আলমুজামুল কাবির, তাবরানি, হাদিস: ১৩৬১৩)। সহিহ বুখারির এক হাদিসে (হাদিস: ১৩১৫) জানাজা নামাজের পর লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিলম্ব না করার নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, “জানাজাকে দ্রুত নিয়ে যাও। কেননা, মৃত ব্যক্তি যদি নেক লোক হয়, তবে তো তাকে তার শুভ পরিণতির দিকেই নিয়ে যাচ্ছে। আর যদি সে মন্দ হয়, সে ক্ষেত্রে তোমাদের ঘাড় থেকে আপদ সরিয়ে দিচ্ছে।”
ইসলামি বিশেষজ্ঞরা মৃত ব্যক্তির গোসল, কাফন-দাফন ও জানাজাসংক্রান্ত যাবতীয় কাজ দ্রুত সম্পন্ন করাকে উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন এবং অপ্রয়োজনে বিলম্ব করাকে মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। সাধারণত, মৃতের জানাজা-দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেলে মৃতের ওলি বা অভিভাবককে উপস্থিত লোকদের নিয়ে দ্রুত জানাজা পড়ে দাফন করে দিতে হয়। এ সময়ের মধ্যে কোনো আত্মীয়স্বজন বা বিশেষ কোনো ব্যক্তির উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলে তার জন্য বিলম্ব করা সমীচীন নয়।
তবে, যদি ওলি দূরে অবস্থানের কারণে স্বাভাবিক সময়ের ভেতরে উপস্থিত হতে না পারেন, সেক্ষেত্রে তার উচিত হলো দ্রুত দাফন করে দিতে বলা, যাতে শরিয়তের হুকুম যথাযথভাবে পালন হয়। যদি ওলি নিজেই অপেক্ষা করতে বলেন, তবে কিছুটা বিলম্বের অবকাশ থাকে। কিন্তু এই বিলম্বও এমন হওয়া যাবে না, যার কারণে মরদেহের মধ্যে পরিবর্তন বা বিকৃতি হওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়। এত বেশি বিলম্ব করা ওলি বা অন্য কারও জন্যই জায়েজ নয়।
ঢাকা থেকে প্রকাশিত আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সম্পাদিত মাসিক আল-কাউসারে একটি ফতোয়ায় বলা হয়েছে, দাফনে দীর্ঘ বিলম্বের জন্য মরদেহের পরিবর্তন ও বিকৃতি রোধে লাশকে হিমাগারে রাখা, ফর্মালিন বা অন্যান্য পচনরোধক ওষুধ দিয়ে রাখা জায়েজ নয়। বরং লাশের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার আগেই দাফন করে দেওয়া জরুরি, এর অধিক বিলম্ব করা গুনাহ। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, “কোনো মুমিন ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর পর কষ্ট দেওয়া তেমন, যেমন জীবিত অবস্থায় তাকে কষ্ট দেওয়া।” (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ১১৯৯০)। আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) এবং ইবনুল মালাক (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তি জীবিতদের মতোই আরাম ও কষ্ট অনুভব করেন। তাই মৃতদেহকে হিমাগারে রাখা তাকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর, যা থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।
জানাজা ও দাফনে বিলম্ব করার প্রবণতা সমাজে যতই ব্যাপক হোক না কেন, তা গ্রহণযোগ্য বা অনুসরণীয় নয়। বরং সবকিছুর ঊর্ধ্বে শরিয়তের হুকুমকে প্রাধান্য দিতে হবে। মৃতের জানাজা-দাফনে অংশ নিতে পারাটাই জীবিতদের একমাত্র কর্তব্য নয়; দাফনের পরও মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের অনেক করণীয় থাকে, যেমন—দোয়া করা, কবর জিয়ারত করা ও শরিয়া-তরিকায় সওয়াব পাঠানোর কাজ করা।
কোরআন ও হাদিসে লাশ দাফনের জন্য এক দিন, তিন দিন বা নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। ইসলামি মূলনীতি হলো, যত দ্রুত সম্ভব দাফন করা, বিলম্ব না করা। তবে শরিয়তসম্মত বা অনিবার্য কারণ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিলম্বের অনুমতি আছে। যেমন—ময়নাতদন্ত বা আইনি তদন্ত, নিকটাত্মীয়ের অপেক্ষা, বিদেশ থেকে মেহমান আনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জরুরি পরিস্থিতি। তবে এসব ক্ষেত্রেও বিলম্ব না করাই উত্তম।
এ সংক্রান্ত হাদিস ও আসারের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) বলেন, জীবিত ব্যক্তি যেসব বস্তু দিয়ে আরাম বোধ করে, মৃত ব্যক্তি তা দিয়ে আরাম বোধ করে। ইবনুল মালাক (রহ.) বলেন, ‘মৃত ব্যক্তি কষ্টদায়ক বস্তু দিয়ে কষ্ট পায়। (মিকাতুল মাফাতিহ, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৭০)। মৃত ব্যক্তিকে হিমাগারে রাখা মূলত তাকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর। এসব কাজ থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।
আপনার মতামত লিখুন :