Facebook Twitter Instagram YouTube

দক্ষতানির্ভর কারিকুলাম ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা


প্রকাশের সময় : আগস্ট ৫, ২০২৬, ১১:০০ অপরাহ্ণ /
দক্ষতানির্ভর কারিকুলাম ও শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড, আর সেই মেরুদণ্ডকে মজবুত করার প্রধান হাতিয়ার হলো সময়োপযোগী কারিকুলাম ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও পাঠ্যসূচি নিয়ে যে ব্যাপক পরিবর্তনের আলাপ শোনা যাচ্ছে, তা জাতির জন্য এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় বন্ধে কঠোর অবস্থান এবং কারিকুলামে যে সংশোধনী আনা হচ্ছে, তা শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে অপরিহার্য। পরীক্ষায় নকল বা অসদুপায় অবলম্বন কেবল একটি অপরাধ নয়, বরং এটি একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাসকে সমূলে বিনাশ করে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এই ব্যাধি দূর করতে কেবল পরীক্ষার হলে কঠোরতা নয়, বরং শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের প্রয়োজন। নতুন সংস্কারে প্রশ্নপত্রের কাঠামো এমনভাবে সাজানো হচ্ছে, যেখানে কেবল মুখস্থ নির্ভরতা দিয়ে পার পাওয়া সম্ভব নয়। যখন মূল্যায়ন পদ্ধতি শিক্ষার্থীর সৃজনশীল মেধা ও ব্যবহারিক জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে হবে, তখন নকল করার সুযোগ ও প্রয়োজনীয়তা—উভয়ই হ্রাস পাবে।

বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের পাঠ্যক্রমকে হতে হবে জীবনমুখী ও দক্ষতানির্ভর। আগের কারিকুলামে অনেক ক্ষেত্রে তাত্ত্বিক জ্ঞানের আধিক্য থাকলেও ব্যবহারিক প্রয়োগের অভাব ছিল। সংশোধিত কারিকুলামে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে পাঠ্যবইয়ের বোঝা কমিয়ে তাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। নতুন পদ্ধতিতে কেবল বছরের শেষে একটি বড় পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে সারা বছরের ধারাবাহিক মূল্যায়নকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে পরীক্ষার চাপ ও ভীতি অনেকাংশেই কমে যাবে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে কারিগরি দক্ষতা অর্জনের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। যে কোনো বড় পরিবর্তনেই কিছু প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ থাকে। নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলের শিক্ষার মানের বৈষম্য দূর করতে প্রযুক্তির সুষম বণ্টন প্রয়োজন।

পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে ভাবনায় থাকেন অভিভাবকরা। সন্তানের সাফল্য তাদের স্বপ্ন, আর ব্যর্থতা তাদের জন্য এক গভীর মানসিক আঘাত। অনেক অভিভাবক অজান্তেই সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন—ভালো ফল অর্জনের জন্য নিরন্তর তাগিদ, অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা, কিংবা নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষাকে ভয় পেতে শুরু করে। এই ভয়ই কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্ত বা অনুপস্থিতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ভালো ফল নয়, বরং সৎ প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন এবং একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করেন, তবে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে। অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। সন্তানকে বোঝাতে হবে, তার সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করতে হবে। উৎসাহ দেওয়া জরুরি; কিন্তু চাপ সৃষ্টি করা নয়। একটি ইতিবাচক ও সমর্থনমূলক পরিবেশ শিক্ষার্থীর মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায় এবং তাকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

অভিভাবকদের অভিযোগ, ভর্তি নীতিমালা জটিল হওয়ায় তারা সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কোন কলেজে আবেদন করলে বেশি সুযোগ থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকেই ভুল পছন্দক্রম দিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও উঠে আসে, যা সাধারণ পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়। ইন্টারনেট সুবিধার অভাব এবং সঠিক দিকনির্দেশনার ঘাটতির কারণে তারা অনেক সময় আবেদন প্রক্রিয়াতেই পিছিয়ে পড়ে। ফলে মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হারায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে। পাশাপাশি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। তা না হলে প্রতি বছরই এসএসসি-পরবর্তী ভর্তি নিয়ে এই বিড়ম্বনা চলতেই থাকবে।

পাশাপাশি অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তনও এখানে বড় ভূমিকা রাখবে- জিপিএ-৫ এর অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে এসে সন্তান কতটা শিখল, সেই বিচারে তাদের উৎসাহিত করতে হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh