
দীর্ঘদিন ধরে ভারত তার বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য বিশ্বজুড়ে শ্রদ্ধা অর্জন করেছিল। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আইনসভায় বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে এখন নিয়মিত গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, বিরোধী দলগুলো ভেঙে ক্ষমতাসীন দল বিজেপিতে মিশে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলো কেন্দ্রীয় আইনসভায় বিজেপিকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
বিরোধী নেতারা প্রকাশ্যে অভিযোগ করছেন, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) বা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) ভীতি দেখিয়ে তাদের দল ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা মদন মিত্রের কথা উল্লেখ করা যায়। গত ১৪ জুলাই ইডি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করার পর ১৫ জুলাই তিনি দল পরিবর্তন করেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার তিন সংসদ সদস্য সুখেন্দুশেখর রায়, সুস্মিতা দেব ও প্রকাশ চিক বরাইক সকালে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বিকেলে রাজ্যসভার মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। বিজেপির একাংশও এই পরিস্থিতির বিরোধিতা করে বলছেন, যাদের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করেছেন, তাদের দলে নেওয়া মেনে নেওয়া কঠিন। তবে কেন্দ্রীয় নির্দেশে বিরোধী দলের নেতাদের দলে টানার এই কৌশল মূলত দুটি কারণে প্রয়োগ করা হচ্ছে—কেন্দ্রে এনডিএ জোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা এবং সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করানো। অর্থাৎ যে তৃণমূল কংগ্রেস ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠা করে এত দিন লড়াই করলেন এবং মুখ্যমন্ত্রী রইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই দল আর তাঁর দল রইল না, সেটি একসময় সিপিআই-এম থেকে বহিষ্কৃত এক নেতার দল হয়ে গেল।
ভারতে এখন রাজনৈতিক দল ভাঙার বিষয়টি অনেকটা হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। লোকসভা সচিবালয় সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ২০ জন এমপিকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যারা ২০২৩ সালে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই) নামক অজানা একটি দলে যোগ দিয়েছিলেন। এই এনসিপিআই দলের নাম এর আগে ভারতে কেউ শোনেনি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় খবর আসছে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট অন্য দল ভাঙিয়ে এখন ৩০৫ থেকে ৩১০ বা ৩১০ থেকে ৩২০–এ পৌঁছে গেল। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল ভেঙে একসময় সিপিআই-এম থেকে বহিষ্কৃত নেতার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
দলবদলের পেছনে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। তৃণমূলের এক এমপি দাবি করেছেন, এমএলএদের জন্য ২০ থেকে ৪০ কোটি এবং এমপিদের জন্য ৫০ থেকে ৭০ কোটি টাকার দর চলছে। তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ১০০ কোটি টাকা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। মহারাষ্ট্রেও শিবসেনা ভাঙার সময় ১৫ থেকে ৫০ কোটি টাকা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, যদিও একনাথ শিন্ডে তা অস্বীকার করেছেন।
ভারতের এই রাজনৈতিক অস্থিরতাকে অনেকে ‘ব্যানানা রিপাবলিক’ বা নিয়মশৃঙ্খলাহীন রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করছেন। কংগ্রেসের নরসীমা রাও প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ১৯৯৩ সালে সংসদ সদস্য কেনাবেচা করে অনাস্থা প্রস্তাব থেকে তাঁর সরকারকে বাঁচিয়েছিলেন। গণমাধ্যমে এই দল ভাঙার প্রক্রিয়াটিকে একটি টি-টুয়েন্টি ম্যাচের মতো উদযাপন করা হচ্ছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের আসন সংখ্যা বৃদ্ধির খবরকে যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তা গণতন্ত্রের প্রতি এক ধরণের উপহাসে পরিণত হয়েছে। দর্শক হিসেবে সাধারণ মানুষ কেবল তাকিয়ে দেখছে, কারণ মাঠ, রেফারি এবং উভয় পক্ষের খেলোয়াড় এখন একটি দলেরই নিয়ন্ত্রণে।
আপনার মতামত লিখুন :