Facebook Twitter Instagram YouTube

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, বাড়ছে রোগী ও মৃত্যুর মিছিল


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৬, ৬:৩১ অপরাহ্ণ /
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, বাড়ছে রোগী ও মৃত্যুর মিছিল

মৌসুমের শুরু থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে উদ্বেগের সময় হিসেবে চিহ্নিত হলেও, এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে আগস্ট মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা অন্যান্য মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। গত ছয় বছরে এই রোগটি শুধু নগর কেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ না থেকে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গুর বৈশ্বিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিশ্বের প্রথম ডেঙ্গু মহামারি রেকর্ড করা হয় ১৭৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়। পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে এর সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ১৯৬৩ সালে ভারতের কলকাতায় এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়। সে সময় রোগটিকে স্থানীয়ভাবে ‘ঢাকা ফিভার’ নামে অভিহিত করা হয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০০ সাল থেকে সরকারিভাবে ডেঙ্গু-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ শুরু হয়, যার ফলে রোগটি দেশে রোগতাত্ত্বিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেতে থাকে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়েও ডেঙ্গু মোকাবিলায় দক্ষ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি।

বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের বর্তমান গতানুগতিক ও সনাতন ব্যবস্থাকেই ব্যর্থতার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন। পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট (ইলেকট) অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সালের মতে, স্থানীয় সরকার বিভাগের কার্যক্রম শুধু ফগিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় কার্যকর সুফল আসছে না। তিনি বলেন, রোগীর ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এছাড়া জনগণের সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা ছাড়া এই রোগ নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন একে বহুমাত্রিক সংকট হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ঘাটতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. গোলাম ছারোয়ার জানান, মশার জীবনচক্র ও অবস্থান না বুঝে শুধু ফগিং করা কার্যকর নয়। একই কীটনাশক দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মশা প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। তিনি রোগী শনাক্ত করে সেই এলাকায় মশা নির্মূল বা ‘কন্ট্রাক ট্রেসিং’ পদ্ধতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ০৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৪১ হাজার ৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১১৩ জন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ৬ হাজার ৩৭৯ জন আক্রান্ত ও ১০ জন মৃত্যু, চট্টগ্রাম বিভাগে ৬ হাজার ১৭৮ জন আক্রান্ত ও ৮ জন মৃত্যু, ঢাকায় (সিটি কর্পোরেশনের বাইরে) ৬ হাজার ১৭ জন আক্রান্ত ও ৩ জন মৃত্যু, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৪ হাজার ৮৯৫ জন আক্রান্ত ও ১৬ জন মৃত্যু, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৫ হাজার ৫০০ জন আক্রান্ত ও ৩৯ জন মৃত্যু, খুলনায় ৬ হাজার ৪৮৭ জন আক্রান্ত ও ১৯ জন মৃত্যু, ময়মনসিংহে ২ হাজার ২৫৭ জন আক্রান্ত ও ১২ জন মৃত্যু, রাজশাহীতে ২ হাজার ২৩০ জন আক্রান্ত ও ৪ জন মৃত্যু, রংপুরে ১ হাজার ৫ জন আক্রান্ত ও ১ জন মৃত্যু এবং সিলেটে ১৮৪ জন আক্রান্ত ও ১ জন মৃত্যু হয়েছে।

চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১ হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন, জুন মাসে ২ হাজার ৯০৭ জন, জুলাই মাসে ৯ হাজার ২০৬ জন এবং আগস্ট মাসে ১৮ হাজার ২৭৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া মৃতের সংখ্যা জানুয়ারি মাসে ২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মে মাসে ১ জন, জুনে ১৩ জন, জুলাইতে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরের গত ৫ দিনে ১৬ জন মারা গেছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারি এই হিসাব কেবল নির্দিষ্ট কিছু হাসপাতালের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইইডিসিআর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন ডেঙ্গুকে জনস্বাস্থ্যের জরুরি সমস্যা হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তিনি তৃণমূল পর্যায়ে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে চিরুনি অভিযানের পরামর্শ দিয়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার সতর্ক করে বলেছেন, এডিস মশা নগর পরিবেশে অভিযোজিত হয়েছে, তাই কেবল হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়ে বা চিকিৎসা দিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; বরং সংক্রমণ প্রতিরোধে টেকসই কৌশল প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব মো. শহীদুল হাসানের সাথে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আজ রোববার সচিবালয়ে এক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশও দেন। তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে এবং মাঠে এর প্রতিফলন থাকতে হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh