
ইসলামি সভ্যতা কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের নাম নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ মানবিক সংস্কৃতি যা জ্ঞান, বিজ্ঞান, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, শিল্প, সাহিত্য এবং নেতৃত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অসামান্য অবদান রেখে চলেছে। ইসলামের প্রথম যুগ থেকে শুরু করে আন্দালুস, বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা ও সমরকন্দের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস আজও মানবজাতির জন্য এক গর্বের স্মারক। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা মুসলিম উম্মাহকে 'উত্তম জাতি' হিসেবে অভিহিত করেছেন, যাদের সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য (সুরা আলে ইমরান : ১১০)।
ইসলামে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম, যার প্রমাণ মেলে কোরআনের প্রথম ওহি 'পড়ো' শব্দের মাধ্যমে। এই আদর্শকে ধারণ করে মুসলিম পণ্ডিতরা ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞান, দর্শন, চিকিৎসা, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন দ্বার উন্মোচন করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে পরিচিত গবেষণামূলক পদ্ধতির প্রাথমিক কাঠামোটি মুসলিম বিজ্ঞানীদেরই তৈরি। পর্যবেক্ষণ, প্রশ্ন উত্থাপন, সুনির্দিষ্ট পরিমাপ, তত্ত্বের অনুমান এবং পরীক্ষা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা যে বৈজ্ঞানিক রীতি অনুসরণ করতেন, তা পরবর্তীতে আধুনিক বিজ্ঞানের রূপ লাভ করে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও ইসলামের অবদান অনস্বীকার্য। নবীজি (সা.)-এর হাদিস, 'আল্লাহ এমন কোনো রোগ পাঠাননি, যার প্রতিকারও তিনি নাজিল করেননি' (বোখারি : ৫৬৭৮), মুসলিম চিকিৎসকদের গবেষণায় অণুপ্রাণিত করেছে। সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কোয়ারেন্টিন পদ্ধতির সুস্পষ্ট নির্দেশও নবীজি (সা.) প্রদান করেছিলেন। তিনি বলেন, 'যদি কোথাও প্লেগ মহামারি দেখা দেয়, সেখানে প্রবেশ কর না। আর যদি তোমরা সেই স্থানে অবস্থান কর, তাহলে সেখান থেকে বের হয়ো না' (বোখারি : ৫৭২৮)।
উমাইয়া খলিফা আল-ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিক ইতিহাসে প্রথম হাসপাতাল নির্মাণের সূচনা করেন। পরবর্তীতে 'বিমারিস্তান' নামে পরিচিত এসব প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ, মানসিক রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড এবং নারী চিকিৎসকের ব্যবস্থা ছিল, যা আধুনিক হাসপাতালেরই পূর্ণরূপ, যা অন্য কোনো সভ্যতায় তখন কল্পনাও করা যায়নি।
বিশ্ববরেণ্য মুসলিম চিকিৎসকদের মধ্যে আবু বকর আল-রাজি তার 'আল-হাওয়ি' গ্রন্থের মাধ্যমে চিকিৎসাশাস্ত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। ইবনে সিনা, যাঁকে 'চিকিৎসাবিদ্যার রাজপুত্র' বলা হয়, তার 'আল-কানুন ফি তিব্ব' গ্রন্থটি সাত শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ইউরোপ ও এশিয়ার পাঠ্যবই ছিল। এছাড়া আধুনিক সার্জারির জনক আবু কাসিম জাহরাবি তার 'আত-তাসরিফ' গ্রন্থে অস্ত্রোপচার পদ্ধতির বর্ণনা দেন। হৃদযন্ত্র ও রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ব্যাখ্যায় ইবনু নাফিস এবং ফার্মাকোলজিতে আল-বিরুনির অবদান মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে।
গণিত বিজ্ঞানে মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খোয়ারিজমির অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তাকে 'কম্পিউটারের জনক' হিসেবে অভিহিত করা হয় এবং তার 'আল-জাবর ওয়াল মুকাবালাহ' গ্রন্থ থেকেই 'অ্যালজেব্রা' শব্দের উৎপত্তি। এছাড়া মাসউদি, ইদরিসি, সিনান পাশা, আল-ফারগানি ও জাবির ইবনে হাইয়ানের মতো মনীষীরা ভূগোল, স্থাপত্য, জ্যোতির্বিদ্যা ও রসায়নে যে মৌলিক ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তা আজও আধুনিক প্রযুক্তির অনেক স্তম্ভের মূল ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।
আপনার মতামত লিখুন :