
জনপ্রশাসনে এখন পদের চেয়ে কর্মকর্তার সংখ্যা অনেক বেশি, যা প্রশাসনিক কার্যক্রমে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, যুগ্ম সচিবের ৫০২টি পদের বিপরীতে প্রায় ১,৫০০ জন কর্মকর্তা কর্মরত আছেন। অতিরিক্ত সচিব পদেও প্রেষণসহ পদসংখ্যা ৩৩৭ হলেও সেখানে বর্তমানে প্রায় ৩৫০ জন কর্মকর্তা কাজ করছেন। ক্ষমতার পালাবদলের বিভিন্ন সময়ে পদোন্নতি দেওয়া হলেও সেই অনুপাতে পদ সৃষ্টি না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসনের এই বিশাল জনবলের মধ্যে প্রায় ৬৫০ জন কর্মকর্তা বর্তমানে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হিসেবে কর্মরত আছেন, যারা কার্যত কোনো দায়িত্ব ছাড়াই নিয়মিত বেতন নিচ্ছেন। এছাড়া আরও অনেক কর্মকর্তা আছেন যাদের নামমাত্র বা অগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছে। জনপ্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, যারা সরকারের আস্থাভাজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, তাদের ওপর একাধিক দায়িত্বের বোঝা চাপানো হচ্ছে। ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিত বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ে তাঁদের প্রায় সবাই জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনটি অনুবিভাগের কাজই গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে, যারা আস্থাভাজন নন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে অগুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা হয়েছে।
একাধিক দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হুমায়ুন কবির অন্যতম। তিনি অতিরিক্ত সচিবের নিজ দপ্তরের কাজের পাশাপাশি জেলা ও মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ এবং কমিটি ও অর্থনৈতিক অনুবিভাগ—এই দুই বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। একই বিভাগের আরেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ খালেদ হাসান ব্লু ইকোনমি, সমন্বয় ও সংস্কার—এই তিনটি অনুবিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আবদুল কাদের উন্নয়ন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অনুবিভাগ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আবদুল মান্নান পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এবং বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব হাবিবুন নাহার ডিপিডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
একাধিক দায়িত্বের ভারে থাকা অন্যান্য কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মনজুর আলম প্রধান, সুরাইয়া আখতার জাহান, এস এম আহসানুল আজিজ, নজরুল ইসলাম, তাহমিনা ইয়াসমিন, আয়েশা আক্তার, মাহবুবুল হক পাটোয়ারী, মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম এবং কে এম আবদুল ওয়াদুদ। কর্মকর্তাদের মতে, একজনের হাতে একাধিক দায়িত্ব থাকার ফলে কোনো কাজই ঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না, যার প্রভাব পড়ছে কাজের গতি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রশাসনের দলীয়করণ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিকীকরণের ফলে জনপ্রশাসন তার নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি হারিয়েছে। গত ২৮ জুলাই ৩২ জন যুগ্ম সচিবকে একসঙ্গে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়, যারা বিগত সরকারের সময় জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিত দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সাবেক সচিব ও বিপিএটিসির রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, সরকার মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নিজেদের পছন্দমতো কর্মকর্তা বসাতে গিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, যা প্রশাসনিক অকার্যকারিতার মূল কারণ।
আপনার মতামত লিখুন :