Facebook Twitter Instagram YouTube

বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির মহামারি: ধ্বংসের মুখে অগণিত জীবন


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৮, ২০২৬, ৭:৪৭ অপরাহ্ণ /
বাংলাদেশে ইয়াবা আসক্তির মহামারি: ধ্বংসের মুখে অগণিত জীবন

‘মেটালফ্রিক’ ছদ্মনামে পরিচিত চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি এখন ইয়াবার মারাত্মক আসক্তিতে ভুগছেন। একসময় পোষা পাখির যত্ন নেওয়া ও তাদের ওড়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া ছিল তাঁর নিত্যদিনের কাজ। কিন্তু এখন তিনি বলছেন, ‘এখন আর আমি এসব করতে পারি না। কে এসবের পরোয়া করে?’ ঢাকার নিজের অগোছালো ঘরে বসে তিনি জানান, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক তাঁর মানসিকতা পুরোপুরি শেষ করে দিয়েছে। থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। তাঁর ভাষ্যমতে, ইয়াবার প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং এটি সেবনের পর টানা তিন দিন জেগে থাকার পর চরম ক্লান্তিতে তিনি ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ঘুমান।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় ৫ শতাংশ মাদকে আসক্ত। নতুন সিন্থেটিক ও আধা সিনথেটিক মাদকের বিস্তার এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। চলতি মাসে সংসদে মাদকসংক্রান্ত অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে একটি বিল অনুমোদন করা হয়েছে। বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক-শ্রেণির’ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে গণ্য করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ২০১৮ সালে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছিল। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের ‘মাদকবিরোধী যুদ্ধের’ আদলে চালানো সেই অভিযানে কয়েক মাসে ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছিল এবং এই অভিযান দরিদ্র এলাকাগুলোতে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘আমরা যদি মাদকের ব্যবহার কমাতে চাই, তাহলে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।’ ঢাকার নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রেও কাজ করেন তিনি। আরিফুজ্জামান জানান, সারা দেশে মাত্র ৩৫০ জনের মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন। জাতীয় ইনস্টিটিউটে একজন বিশেষজ্ঞ হয়তো এক ঘণ্টায় ২০ জন রোগী দেখেন, কিন্তু এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই। ২০১৮-১৯ সালের সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, যাদের সেবা প্রয়োজন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো চিকিৎসা নেন না। তিনি চান সরকার যেন মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করে।

আরিফুজ্জামান আরও বলেন, ইয়াবায় আসক্তি এখন ‘খুবই সাধারণ’ বিষয়। অনেক ব্যবহারকারী ইয়াবার পাশাপাশি বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন বড়িও গ্রহণ করেন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা কোভিড-১৯ মহামারির মতো বাহ্যিক ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। আসক্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় মাদকের খরচ জোগাতে নিজেরাই কারবারি হয়ে ওঠেন, আবার অনেকে বিষণ্নতা বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা থেকে মুক্তি পেতে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। মাদক ও অপরাধবিষয়ক জাতিসংঘের দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্যমতে, নব্বইয়ের দশকের শেষে ইয়াবা তরুণদের সংস্কৃতির অংশ হওয়ার আগে এশিয়ায় ট্রাকচালকদের মতো পেশাজীবীরা এটি সেবন করতেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল।

মিয়ানমারকে ইয়াবার প্রধান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে ধারণা করা হয়। ইউএনওডিসি বলছে, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেকর্ড ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি। মেটালফ্রিক জানান, বাংলাদেশে আসক্তরা সাধারণত সিগারেট দিয়ে শুরু করে গাঁজা ও কফ সিরাপের দিকে যান। প্রথমবার ইয়াবা সেবনের সময় তিনি ভেবেছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে ‘আড্ডা’ দিতে ভালো লাগবে, কিন্তু এটি তাঁর মনকে চরম উত্তেজিত করে তোলে। তিনি বলেন, ‘এই জিনিসটা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।’

বর্তমানে দুই ধরনের ইয়াবা পাওয়া যায়—সস্তা ও দামি। সস্তা ইয়াবা মুখ ও দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি করে। মেটালফ্রিক জানান, নিয়মিত সেবনে স্ট্রোক, দাঁত হারানো বা খিঁচুনি হতে পারে। গত কয়েক বছরে আফিম বা হেরোইন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় ইয়াবা অন্য সব মাদককে হটিয়ে দিয়েছে। ঢাকার রাস্তায়, বিশেষ করে মোহাম্মদপুরে অল্প বয়সী ছেলেদের ছোট প্যাকেটে ইয়াবা বিক্রি করতে দেখা যায়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু এবং শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয়লাভ করে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে রয়েছে। মেটালফ্রিক জানান, সম্প্রতি তাঁর বাবা মারা গেছেন এবং তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে। তিনি ইনস্টাগ্রামে গাঁজা নিয়ে ভিডিও দেখেন এবং বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মূল্যহীন হিসেবে দেখার পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হতাশ। ইয়াবা মানুষকে ‘মিথ্যা আত্মবিশ্বাস’ দেয় এবং অনেকে অদ্ভুত সব ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাস করতে শুরু করে। মেটালফ্রিক বলেন, ‘আমি সুবিধাপ্রাপ্ত… আমাকে আগামীকালের চিন্তা করতে হয় না।’ তিনি ইয়াবা সেবনকারীদের করুণ পরিণতির কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘এটি ধীরে ধীরে বিষপ্রয়োগ, এটি একটি নিখুঁত পরিকল্পনা।’

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo