
সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি, আর মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান বিষয় হলো সময়। এই সময় জানার জন্য মানুষ ঘড়ি নামক যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছে। ঘড়ির সাহায্যে প্রতিটি সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন-রাত্রি এবং পৃথিবীর সমস্ত সৃষ্টিশীল জীব-জন্তু, জলবায়ু ও পরিবেশের পরিবর্তনের হিসাব রাখা সম্ভব হয়েছে। ঘড়ির কাঁটার হিসাব থেকেই ক্যালেন্ডার এবং মাস ও সালের উৎপত্তি হয়েছে। ঘড়ি এমন এক যন্ত্র যা দিয়ে সময় জানা যায়, কিন্তু ধরে রাখা যায় না। দেয়ালঘড়ি, হাতঘড়ি, টেবিলঘড়ি বা স্মার্ট ঘড়ি—এসবের পেছনে রয়েছে কয়েক হাজার বছরের ইতিহাস।
ঐতিহাসিক মতে, প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মিসর ও ব্যাবিলনে সূর্যঘড়ির মাধ্যমে ঘড়ির যাত্রা শুরু হয়। এটি ছিল গোলাকার চাকতিতে একটি নির্দেশক কাঁটা ও দাগ কাটা ঘরের মতো। এরপর জার্মানরা তারাঘড়ি আবিষ্কার করে। খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০ শতকের দিকে মিসরে পানিঘড়ির উৎপত্তি হয়, যা গ্রিকরা ‘ক্লেপসাড্রা’ নামে ডাকত। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো পানিঘড়ি মিসরের ফারাও প্রথম আমেনহোতেপের সমাধিতে সংরক্ষিত আছে। এই পানিঘড়ির পাত্রের গায়ে নির্দিষ্ট দূরত্বের দাগ কাটা থাকত এবং ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার মাধ্যমে পানির স্তরের পরিবর্তন দেখে সময় হিসাব করা হতো।
বিখ্যাত গ্রিক গণিতবিদ, পদার্থবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের (খ্রিষ্টপূর্ব ২৮৭-২১২ অব্দ) হাত ধরে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ির সূচনা হয়। চতুর্দশ শতাব্দীতে ইউরোপীয়রা সূর্যঘড়ির তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রথম যান্ত্রিক ঘড়ি তৈরি করে, যা শুধু ঘণ্টা নির্দেশ করতে পারত। ১৪৯২ সালে আবিষ্কৃত ‘প্যারাগুয়ে অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ক্লক’-এ প্রথম ঘণ্টা, মিনিট ও সেকেন্ডের কাঁটার সূক্ষ্ম ব্যবহার শুরু হয়। পরে ১৬১০ সালে ঘড়ির ডায়ালে কাচ ব্যবহার শুরু হয়। ১৮১৬ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস রোনান্ডস প্রথম ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক ঘড়ি উদ্ভাবন করেন। ১৯৮৩ সালে অস্ট্রিয়ান প্রকৌশলী জোসেফ পালওয়েবার প্রথম পকেটে বহনযোগ্য ডিজিটাল ঘড়ি তৈরি করেন। ১৯২৭ সালে কানাডিয়ান প্রকৌশলী ওয়ারেন মারিসন প্রথম কোয়ার্টজ ক্রিস্টাল ঘড়ি আবিষ্কার করেন এবং ১৯৬৯ সালে জাপানের সেইকো কোম্পানি এই প্রযুক্তির আধুনিক হাতঘড়ি বাজারে আনে। ১৯৭০ সালে এলইডি ডিসপ্লে-যুক্ত প্রথম হাতঘড়ির প্রচলন হয়।
ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরার কারণটি মূলত ভৌগোলিক। আধুনিক ঘড়ি ইংল্যান্ড বা ইউরোপে আবিষ্কৃত হয়েছিল। ইংল্যান্ড উত্তর গোলার্ধে হওয়ায় সূর্য দক্ষিণ আকাশে হেলে থাকে। ফলে সূর্যঘড়ির দণ্ডের ছায়া বাঁ দিক থেকে ডান দিকে ঘোরে। এই অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তার কারণেই ঘড়ির কাঁটা ডান দিকে ঘোরানোর পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। যদি ঘড়ি অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডে আবিষ্কৃত হতো, তবে দক্ষিণ গোলার্ধের কারণে হয়তো কাঁটা বাঁ দিকে ঘুরত। এছাড়া ‘ওয়াচ’ বলতে সাধারণত কবজিতে পরা ঘড়ি এবং ‘ক্লক’ বলতে দেয়াল বা পৃষ্ঠে স্থাপিত ঘড়িকে বোঝায়।
বিশ্বের বৃহত্তম ঘড়ি সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত ‘মক্কা রয়্যাল ক্লক টাওয়ার’। লন্ডনের বিগ বেন বা এলিজাবেথ টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ৩১৬ ফুট (৯৬ মিটার) এবং এর ঘণ্টার ওজন প্রায় ১৩ দশমিক ৭ টন, যা একটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির চেয়েও বেশি। ৩১ মে ১৮৫৯ সালে এটি প্রথম বেজেছিল। বিশ্বের সবচেয়ে চিকন মেকানিক্যাল ঘড়ি হলো ‘অক্টো ফিনিসিমো আলট্রা’, যার পুরুত্ব মাত্র ১ দশমিক ৭০ মিলিমিটার এবং ব্রেসলেটের পুরুত্ব ১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার। এটি মজবুত রাখতে টাংস্টেন কার্বাইড ও টাইটানিয়াম ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু ঘড়ির ডায়ালে ট্রিটিয়াম নামক তেজস্ক্রিয় পদার্থ থাকায় তা রাতে জ্বলে। ঘড়ির উদ্ভাবন কেবল সময় পরিমাপ সহজ করেনি, বরং সময় সম্পর্কে সামাজিক ধারণাকেও বদলে দিয়েছে, যা মানুষকে সময়কে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করেছে।
ঘণ্টাটির ওজন প্রায় ১৩ দশমিক ৭ টন (১৩ হাজার ৭০০ কেজি), যা একটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির ওজনের চেয়ে বেশি।
আপনার মতামত লিখুন :