
বিশ্বজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় নতুন করে বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। গত বছর ব্যাপক বাজেট কাটছাঁটের কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ পুনরায় চালু করার পাশাপাশি নতুন প্রকল্পেও শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে দেশটি।
ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছে, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকার পুরোনো সমুদ্রতলের টেলিযোগাযোগ কেবল প্রতিস্থাপনে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোতে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকানো। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিনিয়োগ পশ্চিম গোলার্ধ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় চীনের কূটনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বৃহত্তর মার্কিন কৌশলের অংশ।
মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেয়া অর্থায়নের প্রস্তাবে ‘ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকার সমুদ্রতলের কেবলের ওপর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলা প্রকল্প’ নামে একটি কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর আওতায় নিরাপদ সমুদ্রতলের কেবল স্থাপন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে চীনা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিশ্বস্ত বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র। এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া ও হাইতি এই সুবিধা পেতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কিছু অংশ নিকারাগুয়ায় থাকলেও দেশটির সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কাজ করবে না।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চীনের টেলিযোগাযোগ, অবকাঠামো ও বন্দর খাতে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তার মতে, চীনের প্রকল্পগুলো শুরুতে কম ব্যয়বহুল মনে হলেও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিলম্ব এবং নিম্নমানের সেবার কারণে প্রকৃত খরচ অনেক বেড়ে যায়। এছাড়া সমুদ্রতলের কেবল প্রকল্পের বাইরে চীনের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের আরও বিভিন্ন প্রকল্প বিবেচনা করছে পররাষ্ট্র দপ্তর।
পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে ৩৪ কোটিরও বেশি ডলার ব্যয়ে ৫০টির বেশি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে, যার অধিকাংশই লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়াকেন্দ্রিক। এসব প্রকল্পের অনেক উদ্যোগ আগেই অনুমোদিত হয়েছিল, তবে ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির (ডিওজিই) বাজেট কমানো ও জনবল ছাঁটাইয়ের কারণে সেগুলো স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।
নতুন পরিকল্পনার মধ্যে আর্জেন্টিনা ও বেলিজে সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া ইকুয়েডর, জ্যামাইকা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়েতে বন্দর পরিচালনা, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ খাতে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় কাজ করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি পরবর্তী দালাই লামা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি সরবরাহ এবং নজরদারি ও সেন্সরশিপ প্রযুক্তি রপ্তানিকারী চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মোকাবিলার উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।
আগামী সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সহযোগিতামূলক মনোভাবের ইঙ্গিত থাকলেও, এই নতুন অর্থায়নের পরিকল্পনা স্পষ্ট করছে যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসছে না ওয়াশিংটন। ফিলিপাইনে আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
আপনার মতামত লিখুন :