
ঢাকার মিরপুরের কাজীপাড়ায় বসবাসকারী মো. মহসিন হোসেনের মতো অনেক যাত্রীর অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া যেতে তিনি কাজীপাড়া স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে চড়ে মতিঝিল নামেন। সেখান থেকে রিকশায় কমলাপুর গিয়ে বাস বা ট্রেন ধরেন। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হলে তাঁর সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে।
ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্র জানিয়েছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের উড়ালপথ নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। কমলাপুরে মেট্রোরেলের জন্য স্টেশনও নির্মিত হয়েছে। বর্তমানে স্টেশনে টাইলস-গ্রানাইট, রং করাসহ অন্যান্য কাজ চলছে। তবে রেললাইন এবং বিদ্যুতের কাজ কেবল শুরু হয়েছে, যা ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজ হিসেবে পরিচিত।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক চলাচল আগামী জানুয়ারিতে শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই যাত্রা হবে যাত্রীবিহীন। যাত্রী নিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল শুরু হবে তার তিন মাস পর, এপ্রিলে।
মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০২২ সালে, যা ২০২৫ সালের জুনে চালুর লক্ষ্যমাত্রা ছিল। সম্প্রসারিত অংশে উড়ালপথ ও কমলাপুরে স্টেশন নির্মাণকাজের জন্য থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানিকে ৫১১ কোটি টাকার চুক্তি দেওয়া হয়। তারা বাংলাদেশের ম্যাকডোনাল্ড স্টিলকে সহযোগী হিসেবে নিয়েছে।
অন্যদিকে, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে বিলম্ব হয়। বিগত সরকারের সময় ৬৫১ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করা হলেও, অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয় কমাতে চাপ দেয়। দর-কষাকষির পর ব্যয় ১৮৬ কোটি টাকা কমিয়ে গত বছর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসন অ্যান্ড ট্যুবরোকে ৪৬৫ কোটি টাকায় নিয়োগ দেওয়া হয়।
ডিএমটিসিএল-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত মতিঝিল-কমলাপুর অংশের কাজের অগ্রগতি ৭৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব জানিয়েছেন, সবকিছু ঠিক থাকলে জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হবে।
প্রক্ষেপণ অনুসারে, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈনিক পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহনের কথা থাকলেও, বর্তমানে চার লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করছেন। কমলাপুর পর্যন্ত চালু হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছে।
মেট্রোরেলের মতিঝিল-কমলাপুর পথের কাজ দুটি অংশে বিভক্ত। ভৌত অংশে উড়ালপথ ও স্টেশন নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত। ট্রেন চালানোর জন্য রেললাইন, লিফট, এস্কেলেটর, মনিটর, ট্রেনের দরজার সঙ্গে মিলিয়ে বাইরের দরজা, সংকেতব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের যন্ত্রপাতি বসানোসহ সাত ধরনের কাজ বাকি রয়েছে। এছাড়া ট্রেন ও স্টেশন ভবনের জন্য সাবস্টেশনসহ বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা স্থাপনও এর অন্তর্ভুক্ত। এই অংশের জন্য নতুন রেল বা কোচের প্রয়োজন নেই, কারণ ২৪ সেট কোচ আগেই আমদানি করা হয়েছে।
লাইন ও বিদ্যুতের খুঁটি এবং তার বসানোর কাজ ৪ জুলাই শুরু হয়েছে এবং আগস্টের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা আছে। তবে সংকেতব্যবস্থা, ভাড়া আদায় ও স্টেশনে প্রবেশের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং প্ল্যাটফর্মের স্বয়ংক্রিয় দরজা বসানোর কাজ শেষ হতে সময় লাগবে। এসব যন্ত্রাংশ জাপানের নিপ্পন সিগন্যাল কোম্পানি থেকে আসার কথা থাকলেও, বিশ্বব্যাপী চাহিদা থাকায় এখনো বাংলাদেশে পৌঁছায়নি।
বিকল্প হিসেবে, অন্য স্টেশনের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক চলাচল নিশ্চিত করা হতে পারে। ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ জানুয়ারির আগেই যন্ত্রাংশ পেয়ে যাওয়ার আশা করছে। দিনের বেলায় উত্তরা-মতিঝিল অংশে যাত্রী চলাচল থাকায়, পরীক্ষামূলক চলাচল রাত ১২টার পর উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত চালানো হবে, যা শেষ হতে বেশি সময় লাগবে।
দেশের প্রথম মেট্রোরেলের উত্তরা-আগারগাঁও অংশ ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর এবং আগারগাঁও-মতিঝিল অংশ গত বছরের ৪ নভেম্বর চালু হয়। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬-এর দূরত্ব ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার এবং মোট স্টেশন সংখ্যা ১৭।
২০১২ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পের ব্যয় ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা, যা বর্তমানে বেড়ে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা জাপানের উন্নয়ন সহযোগী জাইকার কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে।
ভবিষ্যতে উত্তরা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা দৈর্ঘ্য সাড়ে সাত কিলোমিটার বাড়াবে এবং পাঁচটি নতুন স্টেশন যুক্ত করবে। এছাড়া, বিমানবন্দর, সাভার, গাবতলী, মিরপুর, গুলশান, ভাটারা, দাশেরকান্দি পর্যন্ত আরও কয়েকটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ প্রকল্প চলমান বা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
সম্প্রসারিত অংশে উড়ালপথ ও কমলাপুরে স্টেশন নির্মাণকাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৩ সালে।
সবগুলোর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার।
আপনার মতামত লিখুন :