
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দেশের জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। রোববার দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সভায় তিনি মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, গুণগত ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা যেকোনো দেশের জন্য প্রধান সম্পদ এবং সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। বিপরীতে, অপরিকল্পিত ও অদক্ষ জনসংখ্যা দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। তিনি বলেন, একটি জাতির মূল শক্তি তার জনসংখ্যার আকারের ওপর নয়, বরং জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে। অদক্ষ ও বেকার জনগোষ্ঠী আবাসন, শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলে নতুন সংকটের জন্ম দেয়।
দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এই অগ্রযাত্রার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ’ করা। তাঁরই নেতৃত্বে ১৯৭৬ সালে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ গঠন ও জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া জনমিতিক লভ্যাংশের সুফল পেতে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেন এবং নারী শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক উদ্যোগ নেন। ফলে বাল্যবিবাহ কমে এবং নারীদের কর্মসংস্থান ও পরিবার পরিকল্পনার সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ উল্লেখ করে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, আমাদের সীমিত ভূমি ও সম্পদের তুলনায় জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ ও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা কেবল স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে দেশের এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী তরুণ, যা আমাদের বড় সম্ভাবনা বা জনমিতিক লভ্যাংশ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনের মতো দেশগুলো এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উন্নত হয়েছে। আমাদেরও এই তরুণদের দ্রুত দক্ষ করতে হবে, তা না হলে এটি বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত (স্টেম), কারিগরি শিক্ষা ও উদ্ভাবনী দক্ষতায় সমৃদ্ধ করার তাগিদ দেন রাষ্ট্রপতি। এবারের বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’র প্রশংসা করে তিনি এটিকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি দেশের জনসংখ্যা খাতের চারটি প্রধান চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। প্রথমত, প্রবৃদ্ধির হার কমলেও বিশাল ভিত্তির কারণে প্রতিবছর অনেক শিশু জন্ম নিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, গত দেড় দশক ধরে প্রজনন হার ২.৩-এ স্থবির হয়ে আছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনসংখ্যা স্থিতিশীল করতে ২.০-এর কাছাকাছি আনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, অশিক্ষিত ও পিছিয়ে পড়া পরিবারগুলোতে জন্মহার বেশি থাকায় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম নতুন করে সাজাতে হবে। চতুর্থত, বাল্যবিবাহ রোধ, বিয়ের বয়স বাড়ানো এবং কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
সরকার স্বাস্থ্যকে মৌলিক অধিকার মনে করে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ ও ‘চিকিৎসার অভাবে কোনো মৃত্যু নয়’ স্লোগানে কাজ করছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি। উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিস সুবিধা চালুর সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে তিনি সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে পরিকল্পিত পরিবার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও সুশাসন—এই ছয়টি ভিত্তির ওপর জোর দেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে ক্রেস্ট ও সনদ বিতরণ করেন রাষ্ট্রপতি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং। স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা।
আপনার মতামত লিখুন :