
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৫৩২ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। ১৮ অক্টোবর সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩১ জন রোগী। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন জানিয়েছেন, অতীতে কখনো এই হাসপাতালে এত ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়নি। তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা দিয়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়, পরিস্থিতি এর চেয়েও মারাত্মক।
একসময় ডেঙ্গু কেবল রাজধানী শহরের রোগ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে এর বিস্তার সবচেয়ে বেশি। দেশে ২০০০ সালে নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের পর আর কোনো সময় উপকূলীয় জেলায় এই হারে রোগী ভর্তি হয়নি। চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের সব হাসপাতালে মোট ১ লাখ ১০ হাজার ৩১২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে উপকূলীয় ১৯টি জেলার হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ১৪৮ জন, যা মোট রোগীর ৩৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
উপকূলীয় এই ১৯টি জেলা হলো কক্সবাজার, বাগেরহাট, বরগুনা, বরিশাল, ভোলা, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, ফেনী, গোপালগঞ্জ, যশোর, ঝালকাঠি, খুলনা, লক্ষ্মীপুর, নড়াইল, নোয়াখালী, পিরোজপুর, সাতক্ষীরা, শরীয়তপুর ও পটুয়াখালী। এর আগে ২০২৩ সালে সারা দেশে মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগীর মধ্যে ৯৭ হাজার ৫৫২ জন উপকূলীয় এলাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যা ছিল মোট রোগীর ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ। এছাড়া ২০২৫ সালে দেশের মোট ১ লাখ ২ হাজার ৩৫৮ জন রোগীর মধ্যে ৩৫ হাজার ৫১১ জন ছিলেন উপকূলীয় জেলার, যা ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ।
উপকূলীয় এলাকায় ডেঙ্গুর এই প্রকোপ কেন বাড়ছে, তা নিয়ে সরকারি স্তরে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে গবেষক, কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্যবিদেরা বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় এলাকাকে ডেঙ্গুর নতুন সংক্রমণস্থল বা 'ভার্জিন এরিয়া' হিসেবে গণ্য করা, সুপেয় পানির সংকটের কারণে পানি ধরে রাখা, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি না থাকায় পরিচ্ছন্নতায় ত্রুটি ও জলাবদ্ধতা এবং কৃষি খাতের প্রাকৃতিক আধার। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, হাসপাতালের অবস্থান ধরে এই চিত্র পাওয়া গেলেও বাস্তবে রোগীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। তিনি আরও বলেন, উপকূল কয়েক বছর ধরেই সংক্রমণের বড় এলাকা হলেও এ নিয়ে সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই, যা দুঃখজনক।
কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবীরুল বাশার মনে করেন, উপকূলীয় এলাকায় এডিস মশার জন্য সহায়ক পরিবেশ বেশি থাকায় ভাইরাস সেখানে নতুন এলাকা খুঁজছে। মোংলায় সুপেয় পানির তীব্র সংকটের কারণে মানুষ বৃষ্টির পানি ড্রামে সংরক্ষণ করে, যা এডিসের প্রজননস্থল হয়ে ওঠে। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে পৌরসভা ও ইউনিয়ন সদরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। আগস্ট মাসে বরগুনায় আইইডিসিআর-এর জরিপে ১৩৪টি পানি জমে থাকা পাত্রের মধ্যে ২৬টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। সেখানে ব্রুটো ইনডেক্স ছিল ৫৩ দশমিক শূন্য ৬, যা অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতি নির্দেশ করে। আইইডিসিআর-এর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, পিরোজপুরেও জরিপ চালানো হয়েছে এবং সুপেয় পানির সংকটের পাশাপাশি সুপারিগাছের কাণ্ড ও ফুলের নার্সারিতেও এডিসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
উপকূলে ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার মধ্যে ইজিপ্টাইয়ের পাশাপাশি অ্যালবোপিকটাসের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে পাওয়া গেছে। বরগুনার জরিপে ৫৮ ভাগ অ্যালবোপিকটাস ও ৪২ ভাগ ইজিপ্টাই পাওয়া গিয়েছিল। অধ্যাপক কবীরুল বাশার বলেন, বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে এবং অ্যালবোপিকটাস বেশি জীবাণুবাহী হয়ে থাকতে পারে, যা নিয়ে বিশদ গবেষণা প্রয়োজন। চলতি বছর সারা দেশে ডেঙ্গুতে ৩৪২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ১১৭ জনই উপকূলীয় ১৯ জেলার হাসপাতালের। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশীদ স্বীকার করেছেন যে, ডেঙ্গু রোধে সারা দেশে কাজ চললেও উপকূল ঘিরে বিশেষ কোনো কর্মসূচি নেই।
কারণ, ঢাকার হাসপাতালে যারা মারা যাচ্ছে, তারা সবাই ঢাকার বাসিন্দা নয়।.ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০: প্রশ্নটা মশা নাকি সুশাসনের?.চলতি বছরের আগস্টে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) বরগুনায় এডিস মশার ওপর জরিপ করে।
আপনার মতামত লিখুন :