
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ৫৮ দিন বয়সী শিশু হাফছা জাহানকে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তাকে নিয়মিত নেবুলাইজার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাথার ওপরের পাখাটিও বন্ধ থাকায় গরমে শিশুটির শ্বাসকষ্ট আরও বাড়ছে। একইভাবে চট্টগ্রামের পটিয়া ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুরেও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় নেবুলাইজার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে নিয়মিত দেওয়া যাচ্ছে না। পটিয়ায় দেড় বছরের মোফাছিরকে দিনে ছয়বার নেবুলাইজার দেওয়ার কথা থাকলেও শনিবার দেওয়া গেছে মাত্র তিনবার।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব শুধু নেবুলাইজেশনের ওপর নয়, বরং হাসপাতালের সামগ্রিক কার্যক্রমে পড়ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক হাসপাতালে এক্স-রে, ইসিজি ও প্যাথলজি পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। জটিল অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু করতে হয়, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানির অভাবে জেনারেটরও সচল রাখা যাচ্ছে না। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সপ্তাহখানেক আগে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার চলাকালীন বিদ্যুৎ চলে গেলে মুঠোফোনের আলোয় এবং দ্রুত তেল কিনে জেনারেটর চালু করে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে হয়েছিল। বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, বিদ্যুৎ ছাড়া হাসপাতালের যাবতীয় কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে এবং অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালেও অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে গত শনিবার সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর জেনারেটর দিয়ে কাজ শেষ করতে হয়। অস্ত্রোপচার কক্ষের ইনচার্জ বিধান চন্দ্র রায় জানান, জেনারেটর চললেও এসি চালানো সম্ভব হয় না, ফলে ঘাম থেকে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটর থাকলেও জ্বালানি কেনার অর্থ বরাদ্দ না থাকায় তা ব্যবহার করা যাচ্ছে না। পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জেনারেটরের কোনো ব্যবস্থাই নেই, আবার মৌলভীবাজারের কুলাউড়া ও জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রাতে মোমবাতি বা টর্চের আলোয় রোগী দেখতে হয় চিকিৎসকদের।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও। টাঙ্গাইলের সখীপুর ও খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লো-ভোল্টেজের কারণে এক্স-রে মেশিন অচল হয়ে পড়ায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে বাড়তি টাকা খরচ করে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে। এছাড়া হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের জীবনও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। রংপুরের তারাগঞ্জসহ বিভিন্ন হাসপাতালের রোগীরা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় এবং গরমে তাদের কষ্ট বহুগুণ বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার গ্রিড পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানির অভাবে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে রাজধানীসহ দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে। লক্ষ্মীপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্যমতে, চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :