Facebook Twitter Instagram YouTube

১৫ জেলায় ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকি, আজ থেকে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬, ৮:৩৪ পূর্বাহ্ণ /
১৫ জেলায় ডেঙ্গুর বড় ঝুঁকি, আজ থেকে দেশজুড়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান

দেশের ৬৪ জেলায় ছড়িয়ে পড়া ডেঙ্গু পরিস্থিতি আগামী সপ্তাহগুলোতে আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ অন্তত ১৫টি জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি মারাত্মক আকার ধারণ করার আশঙ্কার কথা জানিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আজ শনিবার থেকে দেশজুড়ে তিন মাস মেয়াদি পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতা অভিযান শুরু করছে সরকার। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন।

আইইডিসিআরের চার বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, আগামী সপ্তাহগুলোতে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালী—এই ১৫ জেলায় ডেঙ্গু সংক্রমণ আরও বৃদ্ধি পাবে। জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদরা আগেই সতর্ক করেছিলেন যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ প্রকোপ দেখা দেবে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত সম্প্রতি জানান, সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ চূড়ায় (পিক) পৌঁছাতে পারে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জনসম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু মোকাবিলা অসম্ভব। এ কারণে শনিবারে শনিবারে তিন মাসব্যাপী এই কর্মসূচি চলবে, যাতে একাধিক মন্ত্রণালয়, স্বেচ্ছাসেবক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীরা যুক্ত থাকবেন।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যু হলেও জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, আগস্টে ৪৩ জন এবং সেপ্টেম্বরের প্রথম ১১ দিনেই ৪৪ জন মারা গেছেন। এ বছর এ পর্যন্ত মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪১ জনে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৯,২২০ জন। আক্রান্তের হারে পুরুষ বেশি (৬২ শতাংশ) হলেও মৃত্যুর হারে নারীরা এগিয়ে আছেন (৫২ শতাংশ)। আইইডিসিআরের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর মৃত্যুহার কিছুটা কম (০.২৯ শতাংশ) হলেও তা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ২০২৩ সালে দেশে রেকর্ড ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন আক্রান্ত এবং ১,৭০৫ জন মারা যান, যেখানে মৃত্যুহার ছিল ০.৫৩ শতাংশ। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মৃত্যুহার ছিল যথাক্রমে ০.৪৯ ও ০.৩৪ শতাংশ। আর চলতি বছরের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃত্যুহার ছিল ০.২৮ শতাংশ।

ডেঙ্গুর ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের ৯১.৫ শতাংশই ডেঙ্গুর ডেনভি-৩ (DENV-3) ধরনে আক্রান্ত। বাকি ৮.৫ শতাংশ আক্রান্ত হচ্ছেন ডেনভি-২ (DENV-2) দ্বারা। বিশেষ করে বরগুনা, বান্দরবান ও পিরোজপুরে ডেনভি-২ এর প্রকোপ দেখা গেছে। চিকিৎসকেরা জানান, ডেঙ্গুর চারটি স্ট্রেইন (ডেনভি ১, ২, ৩ ও ৪) সক্রিয় থাকায় দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার আক্রান্তদের ক্ষেত্রে শারীরিক জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এর পাশাপাশি দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে, যেখানে এ বছর ১ হাজারের বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতাকে দায়ী করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাঁরা বলছেন, কলকাতায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বাংলাদেশে গত আড়াই দশকে মশা নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগ না নেওয়ায় এবং মানুষকে কার্যকরভাবে সচেতন ও সম্পৃক্ত না করায় এই রোগ স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকায় তথা বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় ধরনের প্রকোপ দেখা দেয় ২০০০ (2000) সালে। এর আগে ২০১৭ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ ড. কে কৃষ্ণমূর্তির দেওয়া ২২ পৃষ্ঠার কর্মপরিকল্পনা এবং ২০১৯ সালে জ্যেষ্ট কীটতত্ত্ববিদ বি এন নাগপালের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশা নিধনের পরামর্শগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। নাগপাল জানিয়েছিলেন, এডিস মশা মূলত অন্ধকার ও আর্দ্র জায়গায় (টেবিল, সোফা, বিছানার নিচে বা পর্দার পেছনে) অবস্থান করে, যা কেবল সিটি করপোরেশনের কর্মীদের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়।

আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে রেড ক্রিসেন্টের মতো সংস্থাকে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনে কাজে লাগাতে হবে। তিন মাস পর এই কর্মসূচির মূল্যায়ন করে দেশজুড়ে সারা বছর মশা নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে। একই সাথে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকেও এই কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানান। উল্লেখ্য, সংসদে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীও পাঁচ বিভাগে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo