
গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিভেদ তৈরি হলে পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তি সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমত ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। তবে এই ভিন্নমত যেন কোনোভাবেই পারস্পরিক শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬) রাত ১০:০৯ মিনিটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ যদি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যা পরাজিত শক্তিকে পুনরুত্থানের সুযোগ দেয়, তবে তা দেশের গণতন্ত্রের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনবে। এ সময় তিনি দলমত নির্বিশেষে দায়িত্বশীল আচরণ ও পারস্পরিক সহনশীলতার মাধ্যমে 'সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ' নীতিতে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
দেশের চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল গাড়ির লংমার্চ করে যদি এই সমস্যার সমাধান করা যেত, তবে সরকার নিজেই সবার আগে এর আয়োজন করত। জাতীয় সংকটকে পুঁজি করে জনগণকে উত্তেজিত না করে কার্যকর উপায়ে সমাধানের পথে হাঁটার জন্য তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, এই জ্বালানি সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলনে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়া এবং দেশের একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে সরকার কোনো অজুহাতে জনগণের ভোগান্তি এড়াতে চায় না এবং সংকট নিরসনে ইতিমধ্যে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান উল্লেখ করেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট কোনো একক দলের নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। তাই সরকারি ও বিরোধী দলের সব সংসদ সদস্যেরই দায়িত্ব হলো জনগণের সামনে পরিস্থিতির সঠিক চিত্র তুলে ধরা। বিরোধী দলকে সরকারের অংশ বিবেচনা করে তাদের সঙ্গে নিয়েই এই সংকট থেকে দেশ ও জাতিকে বের করে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কেবল বিদ্যুতের গ্রাহক থাকবে না, বরং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদক দেশে পরিণত হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বলেন, সরকার জাতীয় সংসদকে সব আলোচনা ও জাতীয় সমস্যা সমাধানের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের মধ্যে জনগণ বিএনপির ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। তবে কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলও সরকারের অংশ হওয়ায় তাদের সঙ্গে নিয়েই জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চায় সরকার।
ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের বিভিন্ন খাতের ভঙ্গুর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ, শিল্প, শিক্ষা ও ব্যাংকিংসহ প্রায় প্রতিটি খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির পাহাড় তৈরি হয়েছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এসব সমস্যাকে সরকার অজুহাত হিসেবে দাঁড়কাতে চায় না। বিশেষ করে ঋণখেলাপির বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশে খেলাপি ঋণের যে চিত্র দেখানো হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে ফরেনসিক অডিটে তার চেয়েও ভয়াবহ রূপ প্রকাশ পেয়েছে। তবে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে এখন খেলাপি ঋণের অনুপাত কমতে শুরু করেছে।
সংসদে বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও বাকস্বাধীনতা বজায় রয়েছে। তবে বাকস্বাধীনতা যেন কোনোভাবেই 'বাকশালীনতার' সীমা অতিক্রম না করে, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। তিনি বলেন, কোনো বিবেকবান মানুষই দেশে আর ফ্যাসিবাদী বা স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসুক তা চান না। তাই রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গালাগালি পরিহার করতে হবে এবং পারিবারিক পরিবেশে যেসব শব্দ ব্যবহারে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, তা জনপরিসরেও বর্জন করা উচিত।
পরিশেষে, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন। দেশে ন্যায়পরায়ণতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই শহীদদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করা সবার পবিত্র দায়িত্ব।
আপনার মতামত লিখুন :