
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের আপিলের রায় আগামী ৯ জুলাই ঘোষণা করা হবে। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত বেঞ্চ এ রায়ের দিন ধার্য করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের শুনানি শেষ হয়েছে।
আপিলের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক অংশ নেন। অন্যদিকে, আপিলকারীদের পক্ষে আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া এবং মোহাম্মদ শিশির মনির তাদের যুক্তি উপস্থাপন করেন।
শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল। আপিলে পঞ্চদশ সংশোধনীতে কিছু বিষয় জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, আদালত বাকি অংশটুকু দেখবেন। তিনি আরও বলেন, আইন পুরোটা বাতিল না করে কিছু বিধান জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেছেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে, সংবিধান ধ্বংস করা হয়েছে। এই সংশোধনী পুরোটা বাতিল হওয়া উচিত।’ তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তন করা হয়েছে এবং এটি বাতিল হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের জনবিরোধী সংশোধনী আর না হয় এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা নস্যাৎ করা না যায়।
অন্যদিকে, জামায়াতের পক্ষের আইনজীবী শিশির মনির আদালতকে জানান যে, যদি পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটি বাতিল করা হয়, তবে ‘বাকশাল’ ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আদালতকে আরও জানান যে, এই সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছাড়াও অনেক বিষয় জড়িত রয়েছে। তাই হাইকোর্টের রায়ের যে অংশটুকু সংবিধান ও রাষ্ট্রের মৌলিক অধিকারের সাথে সাংঘর্ষিক, তা বাতিল করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখা যেতে পারে। বাকি রাজনৈতিক বিতর্কের অংশটুকু জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হোক, কারণ রাজনৈতিক বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত দিলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
এর আগে গত বছরের ১৩ নভেম্বর বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সর্বোচ্চ আদালত। ওই দিনই সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া আপিল দায়ের করেন, যেখানে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চাওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করেন এবং সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনেন। তবে, ওই রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা হয়নি।
হাইকোর্ট রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ এবং এটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়নি এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জনগণের মধ্যে জন্ম নেয়নি, যার ফলশ্রুতিতে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে।
হাইকোর্ট রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি-সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেন। আদালত বলেন, এই অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, অর্থাৎ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। এছাড়া, পঞ্চদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত ৭ক, ৭খ, ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে, পঞ্চদশ সংশোধনী আইন পুরোটা বাতিল করা হচ্ছে না। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে আগামী জাতীয় সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে। এর মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতির বিষয়, ২৬ মার্চের ভাষণের বিষয়গুলো রয়েছে।
গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় তা বাতিল ঘোষণা করা হয়। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো।
হাইকোর্টের রায়ে ৭ ক, ৭ খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়েছে। ৭ ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ ইত্যাদি অপরাধ এবং ৭ খ সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। ৪৪ অনুচ্ছেদের ২ ধারা, যা হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটিয়ে সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ওইসব বা এর যে কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করার কথা বলতো, সেটিও বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে, ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারসহ অন্যদের রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে আদালত এই রুল জারি করেন। পরে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ অন্যরা রুলে পক্ষভুক্ত হন।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এই সংশোধনীতে শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা এবং জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন সংখ্যা ৪৫ থেকে ৫০ করা হয়।
হাইকোর্টের রায়ে ৭ ক, ৭ খ এবং ৪৪ (২) অনুচ্ছেদও বাতিল করা হয়েছে। ৭ ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ, ইত্যাদি অপরাধ এবং ৭ খ সংবিধানের মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। এদিকে ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা আছে। এই অনুচ্ছেদের ২ ধারা বলছে, এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটিয়ে সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনো আদালতকে তার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ওইসব বা এর যে কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করতে পারবেন। এই অনুচ্ছেদটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে রায়ে। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফারাহ মাহবুব পৌনে দুই ঘণ্টাব্যাপী এ রায় ঘোষণা করেন।
আপনার মতামত লিখুন :