
বাংলাদেশে মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। দেশের প্রায় ৯৮ দশমিক ৪ শতাংশ মা ও শিশু কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবীমার আওতায় নেই। সাধারণ বীমা কোম্পানি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো উদ্যোগের মাধ্যমে মা ও শিশুদের জন্য পৃথক স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা দেশে নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে’ (এমআইসিএস) প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাংলাদেশে মা ও শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট বীমা কভারেজ ২ শতাংশেরও কম। দেশের ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মায়েদের মধ্যে মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ স্বাস্থ্যবীমার সুবিধা পান। এছাড়া ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু এবং ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম—উভয় ক্ষেত্রেই মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ শিশু স্বাস্থ্যবীমার আওতায় রয়েছে।
চিকিৎসা ব্যয়ের এই বিশাল ঘাটতি সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশের পরিবারগুলোকেই সবচেয়ে বেশি হিমশিম খেতে হয়। বর্তমানে দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, এই ব্যক্তিগত খরচের হার কোনোভাবেই ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।
দেশে বেসরকারি বাণিজ্যিক বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত গর্ভবতী নারী ও শিশুদের বীমা সুবিধা দিতে অনীহা প্রকাশ করে। সিজারিয়ান প্রসব, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এবং নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (এনআইসিইউ) মতো চিকিৎসাসেবা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এসব বীমার প্রিমিয়ামও সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়। ফলে পরিবারের কোনো সদস্য গুরুতর অসুস্থ হলে পুরো পরিবারটিই গভীর আর্থিক সংকটে পতিত হয়।
এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০১ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ। এই বরাদ্দে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং অসংক্রামক রোগ শনাক্তকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ ও চিকিৎসকেরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সতর্ক করে বলেছেন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় কমানো, দুর্নীতি প্রতিরোধ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বরাদ্দের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
আপনার মতামত লিখুন :