
কলকাতার একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন কুষ্টিয়ার বিশিষ্ট সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তাঁর স্ত্রী আফসানা শারমিন, তিন বছরের শিশুপুত্র স্বর্ণশীষ দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলী। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর একটি প্রশ্ন সামনে এসেছিল—সনাতন ধর্মাবলম্বী দেবাশীষের মুসলিম স্ত্রী আফসানা শারমিনের শেষকৃত্য কোন রীতিতে হবে? অবশেষে দুই পরিবারের সমঝোতায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, শারমিনের মরদেহ মুসলিম ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কবর দেওয়া হবে।
দেবাশীষের বাবা দিলীপ কুমার দত্ত জানিয়েছেন, পুত্রবধূ আফসানা শারমিন বেঁচে থাকা অবস্থায় তাঁর নিজের মাকে ইচ্ছা প্রকাশ করে বলেছিলেন, মৃত্যুর পর যেন তাঁকে মুসলিম শরিয়ত মোতাবেক দাফন করা হয়। শারমিনের মায়ের সেই দাবির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তাঁর মরদেহ বাপের বাড়ির স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। শারমিন ও তাঁর বাবা আকরাম আলীর মরদেহ তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি সমাহিত করা হবে।
গত বুধবার নিহতদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার বিকেল নাগাদ তাঁদের মরদেহ দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছে তাঁদের সাত বছর বয়সী কন্যাসন্তান মহিমা দত্ত, যাকে দেশের বাড়িতে দাদা-দাদির কাছে রেখে যাওয়া হয়েছিল।
দুই পরিবারের অমতে দীর্ঘদিনের প্রেমের পর ৯ বছর আগে ঘর বেঁধেছিলেন দেবাশীষ ও শারমিন। শুরুতে দেবাশীষ হিন্দু ও শারমিন মুসলিম হওয়ায় দুই পরিবার তাঁদের বিয়ে মেনে নেয়নি। তবে তাঁদের কোলজুড়ে মহিমা ও স্বর্ণশীষ আসার পর নাতি-নাতনিদের মুখের দিকে তাকিয়ে দুই পরিবারই সম্পর্ক মেনে নেয় এবং শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গে দেবাশীষের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
গত ৩ আগস্ট স্ত্রী, পুত্র ও শ্বশুরের চিকিৎসার জন্য ভারতের বেঙ্গালুরুতে যান দেবাশীষ। সেখানকার নারায়ণা হাসপাতালে ১৬ দিন চিকিৎসা শেষে গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার তাঁরা কলকাতায় ফিরে মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ হোটেলে ওঠেন। ওই দিনই তাঁদের দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু দেশে থাকা একমাত্র মেয়ে মহিমার জন্য কেনাকাটা করতে গিয়ে আরও একদিন বেশি থাকার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। আর এই একদিনের বিলম্বই তাঁদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান পরিবারের চার সদস্যসহ মোট ৯ জন।
নিহত দেবাশীষ দত্ত ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে এশিয়ান টেলিভিশন, নাগরিক টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কাজ করা দেবাশীষ কুষ্টিয়া শহরে একজন সৎ ও মেধাবী সাংবাদিক হিসেবে অত্যন্ত পরিচিত ছিলেন। বুধবার সকালে তাঁর মৃত্যুর খবর কুষ্টিয়ায় পৌঁছালে সহকর্মী সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
আপনার মতামত লিখুন :