
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজাবাসীর চরম মানবিক সংকটের এই সময়ে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর করণীয় ও ধর্মীয় দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পবিত্র কুরআনের সুরা কুরাইশ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের আলোকে ক্ষুধা ও ভয়ের বিপরীতে খাদ্য ও নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের সংক্ষিপ্ত সুরাগুলোর মধ্যে সুরা কুরাইশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই সুরায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘যেহেতু কুরায়শের আসক্তি আছে, আসক্তি আছে তাদের শীত ও গ্রীষ্মে সফরের। অতএব, এরা ইবাদত করুক এই গৃহের মালিকের, যিনি এদেরকে ক্ষুধায় আহার দিয়েছেন ও ভীতি হতে এদের নিরাপদ করেছেন।’ (সুরা কুরাইশ)। এই আয়াতগুলো আমাদের দুটি অমূল্য নেয়ামতের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে—ক্ষুধার পর খাদ্য এবং ভয়ের পর নিরাপত্তা লাভ। এ দুটিই হলো সম্মানজনক ও শান্তিময় জীবনের প্রধান স্তম্ভ। মানুষ যখন এগুলো থেকে বঞ্চিত হয়, তখন শুধু তার শরীরই ক্ষুধার্ত হয় না, বরং তার মানবিক মর্যাদা ও স্বস্তি ধুলোয় মিশে যায়।
নিরাপত্তা ও সুস্থতার গুরুত্ব কতখানি, তা রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে সকালে জেগে দেখে সে তার ঘরে নিরাপদ, দেহে সুস্থ ও তার কাছে দিনের খাবার আছে, সে যেন পুরো দুনিয়াই পেয়ে গেছে।’ (তিরমিজি : ২৩৪৬)। এই তিনটি নেয়ামত—হৃদয় শান্ত রাখার মতো নিরাপত্তা, জীবনযাপনে সহায়তার জন্য সুস্থতা এবং প্রয়োজন মেটানোর মতো খাদ্য—একসঙ্গে মিললে মানুষ সব ধরনের অভাব ও অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা কুরাইশদের ক্ষুধা দূর করে রিজিক দিয়েছেন এবং কাবা শরিফের উসিলায় তাদের সুরক্ষিত করেছেন। এগুলো তাদের নিজস্ব কোনো শক্তি ছিল না, বরং আল্লাহর খাঁটি অনুগ্রহ ছিল, যার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা অপরিহার্য।
প্রকৃত কৃতজ্ঞতা বা শোকর কেবল মুখের কিছু বুলি নয়। এটি শুরু হয় অন্তরের স্বীকৃতি দিয়ে, প্রকাশ পায় জিহ্বার আন্তরিক উচ্চারণে এবং সার্থক হয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সৎকর্মের মাধ্যমে। আল্লাহর নেয়ামতের প্রকৃত শোকর আদায়ের একটি বড় অংশ হলো, যারা এই নেয়ামতগুলো থেকে বঞ্চিত, তাদের কষ্ট নিজের হৃদয়ে অনুভব করা। এই প্রসঙ্গে ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ ভাইবোনদের কথা স্মরণ করলে চোখ ভিজে ওঠে। তারা আজ চরম খাদ্য সংকট, তীব্র তৃষ্ণা এবং নিরাপত্তার চরম অনুপস্থিতির মধ্য দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর জীবন কাটাচ্ছেন। বঞ্চনা ও ক্ষুধার ধারালো তলোয়ার যেন তাদের গলার ওপর ঝুলছে।
এই চরম দুঃখ-কষ্টের সময়ে যেসব উদার প্রাণ মানুষের হৃদয় এখনও জীবিত, তাদের এগিয়ে আসা উচিত। সততা ও নিয়ত যাচাইয়ের এই মুহূর্তে বিশ্বস্ত ও সরকারি অনুমোদিত বিভিন্ন মাধ্যমের সাহায্যে ফিলিস্তিনের ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাবার, ওষুধ ও পানি পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ও বিভিন্ন আঞ্চলিক সম্মেলনে ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার রক্ষা ও তাদের স্থিতিশীলতার পক্ষে আরব দেশগুলোর নেতৃত্বের কূটনৈতিক ভূমিকা ও সমর্থনও প্রশংসনীয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন আল-মসজিদুল হারাম থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্যে; তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্বষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১)।
ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করার জন্য দোয়ার দরজা সবসময় উন্মুক্ত। আন্তরিক নিয়ত ও সুন্দর কথা কখনো বৃথা যায় না। গাজা ও ফিলিস্তিনের মানুষের দুর্দশার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়াও একটি বড় দায়িত্ব। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু করণীয় আছে। যে অনুভূতি জাগ্রত করল, যে হৃদয় দিয়ে প্রার্থনা করল কিংবা যে অন্যকে স্মরণ করাল—তারা সবাই এই পুণ্যকর্মে অংশ নিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে তোমাকে প্রশ্ন করে, আমি তো কাছেই। প্রার্থনাকারী যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে আমি তার প্রার্থনায় সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা : ১৮৬)।
ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের জন্য গভীর রাতে অন্তত একটি আন্তরিক দোয়া করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। হে অসহায়দের দয়ালু প্রতিপালক, হে বিপদাপন্নদের সহায়ক, তুমি আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইদের সহায় ও শক্তি হও। তারা ক্ষুধার্ত, তুমি তাদের তৃপ্ত করো; তারা ভীত, তুমি তাদের নিরাপদ করো; তারা বিচ্ছিন্ন, তুমি তাদের ঐক্যবদ্ধ করো; এবং তারা দুর্বল, তুমি তাদের শক্তি দাও। তুমি তাদের ভাঙা মন জোড়া লাগিয়ে দাও, তাদের মৃতদের ওপর রহম করো এবং অসুস্থদের দ্রুত সুস্থতা দান করো।
আপনার মতামত লিখুন :