
সরকারের উচ্চপর্যায়ের ইচ্ছায় আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার ভার আবারও পুরোনো উদ্যোক্তাদের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও নতুন পর্ষদে স্থান পেয়েছেন। পরিচালক নিয়োগের মাত্র দুই দিনের মাথায় বাধ্য হয়ে দুজনকে পর্ষদ থেকে বাদ দিতে হয়েছে। নতুন করে পর্ষদ পুনর্গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকটির মূল নিয়ন্ত্রণ চলে এসেছে চট্টগ্রামভিত্তিক কেডিএস গ্রুপের হাতে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে কেডিএস গ্রুপ আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংকের দায়িত্বে ছিল। এই দুই ব্যাংকেই তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল বিতর্কিত এস আলম গ্রুপ।
১৫ জুলাই আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক শেয়ারধারীদের মধ্য থেকে যে ১৪ জনকে পর্ষদে নিয়োগ দেয়, তাঁদের মধ্যে ৬ জনই কেডিএস গ্রুপ ও গ্রুপটির শীর্ষ নেতৃত্বের আত্মীয়স্বজন। তাঁরা হলেন কেডিএস গ্রুপের চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, তাঁর ছেলে সেলিম রহমান, খলিলুর রহমানের ভাই আহমেদুল হক, কেডিএস গার্মেন্টসের প্রতিনিধি পরিচালক মাহবুব আহমেদ, কেডিএস টেক্সটাইলসের প্রতিনিধি পরিচালক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও কেওয়াই স্টিল মিলসের প্রতিনিধি মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম। এ ছাড়া কেডিএস মালিকদের আত্মীয়রাও নিয়োগ পেয়েছেন। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী এক পরিবার বা গ্রুপ থেকে তিনজনের বেশি পরিচালক থাকার সুযোগ না থাকায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ও মোহাম্মদ শরিফ উদ্দিন তসলিম পদ গ্রহণ করেননি। তাঁদের পরিবর্তে খন্দকার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদকে পরিচালক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পর্ষদে নিয়োগ পাওয়া অন্য পরিচালকদের মধ্যে ব্যাংকটির নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমানও কেডিএস পরিবারসংশ্লিষ্ট। অন্য পরিচালকদের মধ্যে রয়েছেন সর্বশেষ নির্বাচনে ঢাকা-৭ থেকে জামায়াতের হয়ে নির্বাচন করা মো. এনায়াত উল্লা, রফিকুল ইসলাম, ইমাদুর রহমান, নাজমুল আহসান খালেদ, আনোয়ার হোসাইন, আবদুস সালাম ও লিয়াকত আলী চৌধুরী। এ বিষয়ে মো. এনায়াত উল্লা বলেন, তিনি বহুদিন পর ব্যাংকের পরিচালক পদ ফিরে পেয়েছেন এবং নতুন করে আর কাউকে অনিয়ম করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
পর্ষদ পুনর্গঠনের পরপরই নিযুক্ত পরিচালকদের কয়েকজন নানা অনিয়মে আগে চাকরিচ্যুত ও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের ব্যাংকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। এমনকি নবগঠিত পর্ষদের প্রথম সভাতেও এসব বিতর্কিত কর্মকর্তার কয়েকজনকে দেখা গেছে। একই সঙ্গে নতুন পর্ষদ দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান বদিউর রহমান বলেন, তিনি দীর্ঘ দিন পর ব্যাংকে ফিরেছেন এবং তাঁর মূল দায়িত্ব পেশাদারির সঙ্গে ব্যাংক পরিচালনা করা। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগে যাঁদের চাকরি গেছে, তাঁদের ফিরিয়ে আনার সুযোগ নেই। নতুন করে অনিয়ম হলে ব্যাংকটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে এবং চেয়ারম্যান হিসেবে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই তাঁর প্রধান কাজ। তিনি আরও জানান, পর্ষদ সভার দিন অনেকে দেখা করতে এসেছিলেন, তাই পরিবেশ ভালো ছিল না এবং ডিএমডি নিজের ইচ্ছাতেই পদত্যাগ করেছেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংকটি এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ওই সময় ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন এস আলমের ভাই আবদুস সামাদ লাবু। ২০২৪ সালের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পর্ষদ ভেঙে দিয়ে স্বতন্ত্র পর্ষদ গঠন করেছিল। স্বতন্ত্র পরিচালকদের সময়ে নিরীক্ষায় বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য উঠে আসে। আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি এবং ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা যায়, ২০২২ সালের ১৫ জুন ব্যাংকের ৩৭৪তম পরিচালনা পর্ষদ সভায় তৎকালীন চেয়ারম্যান সেলিম রহমানের জন্য এক কোটি টাকা সীমার মধ্যে গাড়ি কেনার অনুমোদন দেওয়া হলেও, পর্ষদের অনুমোদন তোয়াক্কা না করে ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে মার্সিডিজ বেঞ্জ কেনা হয়। একইভাবে ২০২৩ সালের আগস্টে কোনো অনুমোদন ছাড়াই অপর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুস সামাদের জন্য ৩ কোটি ২৩ লাখ ৬৭ হাজার টাকায় একই মডেলের আরেকটি মার্সিডিজ কেনা হয়। গাড়ি দুটি ব্যাংকের নিজস্ব নামে নিবন্ধন না করে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের নামে কেনা হয়েছিল এবং মূল ব্যাংকের ফিক্সড অ্যাসেট রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তির কারণে গাড়ি দুটি ইতিমধ্যে ব্যাংকের হেফাজতে আনা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে শোকজ নোটিশ জারি ও অর্থ পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের আমানত গত বছরের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৫৪ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা। তখন ব্যাংকটির ঋণ বা বিনিয়োগ ছিল ৫০ হাজার ১২১ কোটি টাকা। ব্যাংকটির ঋণের ১৭ দশমিক ৬১ শতাংশ খেলাপি। গত বছর ব্যাংকটি নিট মুনাফা করেছে ৮৫ কোটি টাকা। উচ্চ খেলাপির কারণে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শেয়ারধারীদের কোনো লভ্যাংশ দেয়নি ব্যাংকটি। এতে ব্যাংকটি শেয়ারবাজারে জেড ক্যাটাগরিতে চলে গেছে। সারা দেশে ব্যাংকটির রয়েছে ২২৬টি শাখা এবং ৫ হাজার ৫৯৩ জন কর্মী। সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া উচিত এবং ব্যাংক যেন কারও প্রভাবে ব্যবহৃত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
আপনার মতামত লিখুন :