Facebook Twitter Instagram YouTube

খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে উমাইয়া: ইসলামি খেলাফতের উত্থান-পতনের ইতিহাস


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৭, ২০২৬, ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ /
খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে উমাইয়া: ইসলামি খেলাফতের উত্থান-পতনের ইতিহাস

সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে বিশ্বজুড়ে একের পর এক মুসলিম সাম্রাজ্য ও রাজবংশের উত্থান ঘটেছে। এই সাম্রাজ্যগুলো কেবল রাজনৈতিক শাসনই প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং জ্ঞান-বিজ্ঞান, শাসনব্যবস্থা, স্থাপত্যকলা ও সংস্কৃতির বিকাশে অনন্য অবদান রেখে গেছে। বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এবং ইসলামী সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করা এমন কিছু প্রধান রাষ্ট্রীয় শক্তির ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময় ও বৈচিত্র্যপূর্ণ।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওফাতের পর ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে (১১ হিজরি) খোলাফায়ে রাশেদিনের মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রথম পর্যায় শুরু হয়, যা ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ (৪০ হিজরি) পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। আরব উপদ্বীপের গণ্ডি পেরিয়ে এই রাষ্ট্র দ্রুতই একটি আঞ্চলিক পরাশক্তিতে পরিণত হয়। পশ্চিমে লিবিয়া, মিসর, সিরিয়া, ইরাক ও ইরান হয়ে পূর্বে খোরাসান পর্যন্ত এবং দক্ষিণে আরব উপদ্বীপ থেকে উত্তরে আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান পর্যন্ত এই খেলাফত বিস্তৃত ছিল। চারজন খলিফা পরামর্শ ও সর্বসাধারণের সম্মতির (বাইয়াত) ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে এই রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেন।

খোলাফায়ে রাশেদিনের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) রিদ্দার যুদ্ধ বা ধর্মত্যাগীদের দমন করে আরব উপদ্বীপকে ঐক্যবদ্ধ করেন এবং পবিত্র কোরআন সংকলনের উদ্যোগ নেন। দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.)-এর আমলে সাম্রাজ্যের সীমানা ব্যাপক বিস্তৃত হয়। তিনি বিচার বিভাগ, বিভিন্ন প্রশাসনিক দপ্তর (দেওয়ান) এবং হিজরি সন প্রবর্তন করেন। তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান বিন আফফান (রা.) বিজয়ের ধারা অব্যাহত রাখেন, প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন করেন এবং সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে একই প্রাতিষ্ঠানিক কোরআনের অনুলিপির অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন। এই শাসনকালে রাষ্ট্রের বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মজবুত ভিত্তি স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি বসরা, কুফা ও ফুস্তাতের মতো নতুন শহর নির্মাণ, নগর উন্নয়ন, প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন এবং আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটে।

হজরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর মুসলিম জাহানে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল শুরু হয়। খলিফা হযরত আলী (রা.) এবং আমীর মুয়াবিয়ার মধ্যে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধ (৩৭ হিজরি) মুসলিম উম্মাহর মধ্যে রাজনৈতিক বিভেদ আরও বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীতে খারেজি সম্প্রদায়ের উত্থান এবং তাদের হাতে হযরত আলী (রা.)-এর শাহাদাতের মধ্য দিয়ে খোলাফায়ে রাশেদিনের অবসান ঘটে।

এরপর শুরু হয় উমাইয়া খিলাফত (৪১-১৩২ হিজরি/ ৬৬১-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ)। অভ্যন্তরীণ বিরোধের অবসান ও মুসলিমদের রক্তপাত বন্ধ করতে হযরত হাসান বিন আলী (রা.) আমীর মুয়াবিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলে উমাইয়া বংশের সূচনা হয়। মুয়াবিয়া (রা.) তার পুত্র ইয়াজিদকে পরবর্তী উত্তরাধিকারী মনোনীত করার মাধ্যমে ইসলামী ইতিহাসে প্রথম রাজতান্ত্রিক বা বংশানুক্রমিক শাসনব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটে। সিরিয়ার দামেস্ককে রাজধানী করে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্যে আরবীয় সংস্কৃতির প্রভাব ছিল বেশি। পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগরের তীর (মরক্কো ও স্পেন) থেকে শুরু করে পূর্বে চীনের সীমান্ত সংলগ্ন কাশগড় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে এটি এক বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়।

উমাইয়া বংশের প্রতিষ্ঠাতা মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান দামেস্ককে রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। পরবর্তী সময়ে আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান উমাইয়া শাসনকে পুনর্গঠিত করেন, দাপ্তরিক ভাষা আরবি করেন এবং প্রথম ইসলামী মুদ্রা চালু করেন। তার উত্তরসূরি ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের আমলে সিন্ধু ও স্পেন বিজয়সহ সাম্রাজ্যের ব্যাপক ভৌগোলিক ও স্থাপত্যের প্রসার ঘটে। উমাইয়া খলিফাদের মধ্যে ওমর বিন আবদুল আজিজের সংক্ষিপ্ত শাসনকাল ন্যায়বিচার, সততা এবং সুশাসনের জন্য ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তবে শেষ খলিফা মরওয়ান বিন মুহাম্মদ অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার মুখে এই বংশের পতন ঠেকাতে ব্যর্থ হন। উমাইয়া আমলে প্রশাসনিক সংস্কার, আরবি ভাষার দাপ্তরিক স্বীকৃতি, নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন ছাড়াও কায়রোয়ান ও ওয়াসিতের মতো নতুন শহর এবং বিখ্যাত সব মসজিদ ও প্রাসাদ নির্মাণসহ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল।

খোলাফায়ে রাশেদিন (১১-৪০ হিজরি/ ৬৩২-৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ)

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Alokito Bangladesh