
বাংলাদেশে তরুণ ও অবিবাহিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি/এইডস সংক্রমণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আশা প্রকাশ করা হয়েছে যে, সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে দ্রুতই এই সংক্রমণের হার নিয়ন্ত্রণে আসবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইচআইভি/এসটিডি কর্মসূচির সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৯ সালে দেশে প্রথম এইচআইভি রোগী শনাক্তের পর থেকে গত এক বছরে নতুন রোগী শনাক্তের হার পূর্বের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। আগামী ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবসে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে আক্রান্তের এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস/এসটিডি বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. খালিদ সাইফুল্লাহ জানান, পরীক্ষা ও স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করাই আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মের অবিবাহিতদের মধ্যে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। এর পেছনে অনিয়ন্ত্রিত যৌন জীবন, সমকামিতা, ব্যভিচার ও নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণের প্রভাব রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেন্দ্রিক জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কারণেও এই ভাইরাস ছড়াচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে আনুমানিক মোট এইচআইভি আক্রান্তের (পিএলএইচআইভি) সংখ্যা ১৭ হাজার ৪৪০ জন। এর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪ হাজার ৩১৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সামাজিক পরিবর্তনের একটি বড় চিত্র তুলে ধরে তথ্যে দেখা যায়, আগে বিবাহিতদের মধ্যে সংক্রমণের হার বেশি থাকলেও বর্তমানে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আক্রান্তের হার প্রায় ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী কর্মক্ষম তরুণ সমাজ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে সচেতনতার অভাব, অনিরাপদ জীবনযাপন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাবই সংক্রমণের মূল কারণ। মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর প্রায় ৫৬ শতাংশই নির্দিষ্ট কিছু ঝুঁকিপূর্ণ বা 'কি পপুলেশন'-এর অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়া নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ১২ শতাংশ প্রবাসী এবং ১১ শতাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ রয়েছেন। ভৌগোলিক অবস্থান এবং সীমান্ত এলাকায় যাতায়াতের কারণে এই ঝুঁকিগুলো আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে。
এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ১৯৯১ সাল থেকে মিয়ানমারের আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গারা এ দেশে আসতে শুরু করে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার কয়েক লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়। ১৯৮৯ সালে দেশে প্রথম এইডস রোগী শনাক্ত হলেও রোহিঙ্গাদের আগমনের পর এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তারা সেখান থেকে এইডস বহন করে নিয়ে আসেন এবং এ দেশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে গিয়ে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েন। এছাড়া বিদেশ থেকে আসা বাংলাদেশীদের মাধ্যমেও এই রোগ ছড়াচ্ছে বলে তিনি জানান।
সংক্রমণ রোধে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে এইডস নির্মূল করার লক্ষ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজিস) অর্জনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার '৯৫-৯৫-৯৫' কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় ৯৫ শতাংশ আক্রান্তকে শনাক্ত করা, শনাক্তদের ৯৫ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং চিকিৎসাধীন ৯৫ শতাংশের শরীরে ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বর্তমানে শনাক্ত হওয়া রোগীদের মাত্র ৭৪ শতাংশ নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় রয়েছেন। মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করা বা অনিয়মিত ওষুধের কারণে এই হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের ডা. শ্রীনিবাস পাল সাম্প্রতিক প্রবণতা সম্পর্কে বলেন, গত দুই-তিন বছরে মূলত দুটি গ্রুপে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে—একটি হলো মাইগ্র্যান্ট বা প্রবাসী গ্রুপ এবং অন্যটি এমএসএম (পুরুষের সাথে পুরুষের যৌন সম্পর্ক)। তিনি আরও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে ২০ থেকে ২২ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যেও এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে। আমাদের সমাজে অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা না হওয়ায় সচেতনতা তৈরিতে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে এইচআইভি প্রতিরোধ কার্যক্রমে যুক্ত করে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছানো জরুরি।
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ২১: ০০আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ২১: ০৩
আপনার মতামত লিখুন :