Facebook Twitter Instagram YouTube

গুমের বিলে তদন্তের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, সংশোধনের দাবি


প্রকাশের সময় : আগস্ট ২৯, ২০২৬, ৮:৩৩ অপরাহ্ণ /
গুমের বিলে তদন্তের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন, সংশোধনের দাবি

গুম ও মানবাধিকার সংক্রান্ত দুটি বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বাহিনীকেই দেওয়ার বিধান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্যরা। তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত না করে এই বিল দুটি পাস করা হলে গুমের ঘটনার বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার বিকেলে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) আয়োজিত এই সভায় গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ—উভয় আইনেই একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন তদন্তপ্রক্রিয়া থাকা অত্যন্ত জরুরি। তদন্তের এই প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা না হলে তা সবার সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা বা ধোঁকা দেওয়ার মতো হবে। কারণ, নিজের বিচার কখনো নিজে করা সম্ভব নয়। প্রতিবেশী কোনো দেশে এমন ব্যবস্থার নজির নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন বড় পরীক্ষা হলো সংসদের স্থায়ী কমিটি এই দুটি আইন নিয়ে কী করবে এবং তারা বিশেষজ্ঞদের মতামত কতটা গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে আদালতের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আমাদের আদালত ব্যর্থ হয়েছে, কারণ মানুষ আদালতের কাছে গিয়ে কোনো সুরাহা পায়নি। সরকার আগের মতো নীরব থাকবে নাকি জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করবে, তা-ও একটি বড় পরীক্ষা।

সাবেক গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা গুমের অভিযোগ তদন্তের কার্যকর ক্ষমতা যদি মানবাধিকার কমিশনের হাতে না থাকে, তবে এমন আইন থাকার চেয়ে না থাকাই শ্রেয়। তিনি প্রশ্ন তোলেন, স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা না দিয়ে বিপুল অর্থ খরচ করে পাঁচজন commissioner-কে গাড়ি, নিরাপত্তা ও অফিস দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। প্রস্তাবিত আইনে কমিশনকে কেবল বাহিনীর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া বা তাদের মাধ্যমে অনুসন্ধানের ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে কার্যকর তদন্ত সম্ভব হবে না।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুমের শিকার এবং বর্তমান ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান) বলেন, বর্তমান সংসদ হলো মজলুমদের মিলনমেলা। সেখানকার প্রায় প্রতিটি সংসদ সদস্য বা তাঁদের পরিবার গত ১৭ বছরে কোনো না কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। অথচ সেই মজলুমদের হাত দিয়েই এমন একটি আইন পাস হতে যাচ্ছে, যা গুমের পথকে আরও সহজ করে তুলবে।

আলোকচিত্রী শহিদুল আলম বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সুবিধার্থে আইন তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে, অথচ এই বাহিনীগুলোই এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব হলো নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা, তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী চলা নয়। তিনি সরকারকে মনে করিয়ে দেন যে, নিরাপত্তা বাহিনীকে খুশি করা বা নিজেদের স্বার্থ দেখা সরকারের কাজ নয়, বরং জনগণের স্বার্থে কাজ করাই তাদের দায়িত্ব।

সাবেক গুম কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস সরকারের আশ্বাসের সমালোচনা করে বলেন, সরকার বারবার বলছে তারা গুম করবে না। যদি গুম না-ই করা হয়, তবে আইনগত ফাঁকফোকর বা দরজা কেন খোলা রাখা হচ্ছে? দরজা খোলা থাকলে ভবিষ্যতে কেউ না কেউ সেই সুযোগ ব্যবহার করবেই।

আলোচনা সভায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও অংশ নেন। এ সময় তাঁরা নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান ও জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। সম্প্রতি মোংলায় কোস্টগার্ড পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া মিরাজ শেখের সন্ধান দাবি করেন তাঁর বোন লিজা ইসলাম।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি দাবি পেশ করেন। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—মোংলায় নিখোঁজ মিরাজ শেখসহ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম হওয়া সবার সন্ধান দেওয়া, গুমের স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করা, গুম কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ বাস্তবায়ন, অতীতের গুমের বিচার করা, গুম প্রতিরোধ আইন সংশোধন করা, গুমের শিকার পরিবারের সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এইচআরএসএসের সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম। এছাড়া আরও বক্তব্য রাখেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী এবং এইচসিএইচআরের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সহকারী মানবাধিকার কর্মকর্তা সাবরিন আহমেদ।

আগামীকাল ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে সভার আয়োজন করে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Prothom Alo