
ফুটবল বিধাতা হয়তো সব গল্পে সুখী সমাপ্তি লেখেন না। যদি লিখতেন, তবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের মঞ্চটা লিওনেল মেসির জন্য হতে পারতো এক রূপকথার শেষ পাতা। কাতার বিশ্বকাপের সেই অতিমানবিক ও মহাকাব্যিক অর্জনের পর বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবল রোমান্টিক আশা করেছিলেন যে, বিদায়বেলায় চেনা জাদুকর আরও একবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন। কিন্তু ফুটবল যেমন দুহাত ভরে দেয়, তেমনি কখনো কখনো নির্মমভাবে কেড়েও নেয়। কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে দিয়ে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতেই বিদায় নিতে হলো ফুটবল ঈশ্বরকে।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগেও গল্পটা এমন বিষাদময় ছিল না। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে আর্জেন্টিনার শিরোপা ধরে রাখার মিশন আর মেসির শেষ বিশ্বকাপকে রাঙিয়ে রাখার স্বপ্ন নিয়ে কোটি চোখ তাকিয়ে ছিল আমেরিকার মাঠগুলোর দিকে। কিন্তু আধুনিক ফুটবলের গতি, শারীরিক শক্তি আর প্রতিপক্ষের নিখুঁত ট্যাকটিকাল ব্লকের সামনে এবার চেনা জাদুকরকে বড্ড একাকী লেগেছে। বয়স আর সময়ের অমোঘ নিয়মকে ফাঁকি দিয়ে জাদুদণ্ডের শেষ ছোঁয়া দিয়ে দলকে টেনে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা তিনি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু ভাগ্য এবার সহায় হয়নি।
শেষ বাঁশি বাজার পর ক্যামেরা আর কোটি জোড়া চোখ শুধু একজনের দিকেই নিবদ্ধ ছিল। মাঠে নিথর দাঁড়িয়ে থাকা ১০ নম্বর জার্সিধারী সেই মানুষটি, যিনি যুগের পর যুগ ফুটবল বিশ্বকে আনন্দ-উল্লাসে বুঁদ করে রেখেছিলেন, আজ তাঁর নিজের চোখেই টলমল করছিল জল। এই শূন্যতা শুধু আর্জেন্টিনার নয়, এই শূন্যতা পুরো ফুটবল বিশ্বের। ২০১৪ সালের মারাকানার ট্রাজিক ফাইনাল কিংবা ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে সাময়িক অবসরের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, মেসির ফুটবল ক্যারিয়ার সবসময়ই চরম নাটকীয়তায় ভরা ছিল। ২০২১-এর কোপা আমেরিকা এবং ২০২২-এর কাতার বিশ্বকাপে ট্রফি জিতে তিনি অমরত্বের চূড়ায় পৌঁছালেও, ২০২৬-এর মঞ্চে নিয়তির অন্য এক স্ক্রিপ্ট লেখা ছিল।
খেলার পরিসংখ্যান কিংবা ইতিহাসের পাতায় হয়তো লেখা থাকবে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে মেসি কিছুই পাননি। কিন্তু ফুটবল কি কেবলই ট্রফি আর মেডেলের হিসাব? গত দুই দশক ধরে মেসি মানুষকে যে আনন্দ উপহার দিয়েছেন, তা কোনো ধাতব ট্রফির মাপকাঠিতে বিচার করা অসম্ভব। তিনি এবার মেডেল না পেলেও, মাঠ থেকে টানেলের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় প্রতিপক্ষ ভক্তদের দাঁড়িয়ে দেওয়া করতালি আর মানুষের চোখের জল প্রমাণ করে গেছে—তাঁর অর্জন ট্রফির চেয়েও বহুগুণ বেশি। তিনি ফুটবলকে যা দিয়েছেন, তা ফুটবল ইতিহাসের ডিএনএ-তে মিশে আছে। মারাকানার কান্না যেমন কাতারে গিয়ে হাসিতে রূপ নিয়েছিল, ফুটবলের চিরন্তন চক্রে এবার বিদায়ের সুরটা বড্ড করুণ ও অসমাপ্ত। ট্রফিহীন এই বিদায় হয়তো আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে থাকবে, কিন্তু মেসি তাঁর ড্রিবলিং, ফ্রি-কিক আর মাঠের বিশুদ্ধ সৌন্দর্যের জন্য ফুটবল রোমান্টিকদের মনে চিরকাল অমর থাকবেন।
আপনার মতামত লিখুন :