
সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম এবং সূর্যের সবচেয়ে নিকটবর্তী গ্রহ বুধ আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সংকুচিত হচ্ছে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিজ্ঞানীদের আগের হিসাবের তুলনায় গ্রহটি প্রায় ১০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি সংকুচিত হয়ে থাকতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী ‘জিওফিজিক্যাল রিসার্চ লেটার্স’-এ এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। জার্মান অ্যারোস্পেস সেন্টারের ইনস্টিটিউট অব স্পেস রিসার্চের গ্রহবিজ্ঞানী গাকু নিশিয়ামার নেতৃত্বাধীন গবেষক দলটি মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘মেসেঞ্জার’ মহাকাশযানের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তারা বুধের সমগ্র পৃষ্ঠের রুক্ষতার একটি বৈশ্বিক মানচিত্র তৈরি করে এই গবেষণাটি পরিচালনা করেন।
বুধের পৃষ্ঠে থাকা বিভিন্ন ভাঁজ, ফাটল ও খাড়া প্রান্তের মতো সংকোচনজনিত ভূতাত্ত্বিক কাঠামোগুলো থেকে গ্রহটির সংকুচিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু খাড়া ফাটল প্রায় ১.৬ কিলোমিটার (১ মাইল) উঁচু এবং শত শত মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। গবেষকদের মতে, প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে ধূলিকণা ও গ্যাসের ঘূর্ণন থেকে সৃষ্টি হওয়া এই গ্রহটি একসময় অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ভেতরের তাপ হ্রাস পাওয়ায় বুধের অভ্যন্তরভাগ সংকুচিত হতে শুরু করে।
তবে এই সংকোচনের চিহ্ন সব জায়গায় সমানভাবে স্পষ্ট নয়। কোটি কোটি বছর ধরে গ্রহাণু ও ধূমকেতুর উপর্যুপরি আঘাতে বুধের পৃষ্ঠে যে অসংখ্য গর্ত ও ধ্বংসাবশেষ তৈরি হয়েছে, তা অনেক পুরোনো ফাটল ও চিহ্নকে ঢেকে দিয়েছে বলে গবেষকরা মনে করছেন। নিশিয়ামা ও তার দল দেখতে পান, পৃষ্ঠের অধিক রুক্ষ অংশে মসৃণ এলাকার তুলনায় সংকোচনের চিহ্ন কম দৃশ্যমান। এই ঢাকা পড়ে থাকা অংশগুলো হিসাবে নিলে বুধের ব্যাসার্ধ প্রায় ১১.৬ কিলোমিটার (৭.২ মাইল) পর্যন্ত কমে গিয়ে থাকতে পারে। অথচ আগের গবেষণাগুলোতে এই সংকোচনের পরিমাণ মাত্র ১ থেকে ২ কিলোমিটার (০.৬ থেকে ১.২ মাইল) এবং সর্বোচ্চ ৭ কিলোমিটার (৪.৩ মাইল) বলে ধারণা করা হয়েছিল।
সূর্য থেকে গড়ে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মাইল বা ৫ কোটি ৮০ লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বুধ মাত্র ৮৮ দিনে সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করে। পৃথিবীর পর এটি সৌরজগতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘন গ্রহ, যার পেছনে রয়েছে এর বিশাল ধাতব কেন্দ্র। গবেষক নিশিয়ামার মতে, সংকোচন বেশি হওয়ার অর্থ হতে পারে গ্রহটির কেন্দ্র আরও বড় এবং এতে সিলিকনের মতো হালকা উপাদানের উপস্থিতি কম রয়েছে। অথবা সৃষ্টির শুরুতে গ্রহটির তাপমাত্রা বিজ্ঞানীদের ধারণার চেয়েও বেশি ছিল।
অবশ্য এই নতুন হিসাব নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কিছুটা দ্বিমত ও সতর্কতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের অধ্যাপক পল বায়র্ন মনে করেন, অত্যন্ত রুক্ষ অঞ্চলের ফাটলগুলো আগের গবেষণায় হয়তো শনাক্ত করা যায়নি। অন্যদিকে, মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হ্যানেস বার্নহার্ডট মনে করেন, বুধের আকার যদি এতটা হ্রাস পেয়ে থাকে, তবে এর পৃষ্ঠে আরও বড় ও স্পষ্ট ভাঁজ থাকার কথা ছিল। শুধুমাত্র কক্ষপথের তথ্য দিয়ে এই সংকোচনের সঠিক মাত্রা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বুধের এই সংকোচন রহস্যের আরও নিখুঁত সমাধান দিতে পারে ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) এবং জাপানের যৌথ অভিযান ‘বেপিকলোম্বো’। দীর্ঘ আট বছরের যাত্রা শেষে চলতি বছরের শেষের দিকে এই মিশনের দুটি মহাকাশযান বুধের কক্ষপথে প্রবেশ করবে। মেসেঞ্জার মূলত গ্রহটির উত্তর গোলার্ধের উচ্চ-রেজল্যুশনের তথ্য সংগ্রহ করেছিল, কিন্তু বেপিকলোম্বো দক্ষিণ গোলার্ধসহ পুরো গ্রহের উচ্চতা, রুক্ষতা, মাধ্যাকর্ষণ, ভূত্বকের পুরুত্ব এবং খনিজের গঠন নিয়ে বিস্তারিত বৈশ্বিক পরিমাপ চালাবে। গবেষকদের আশা, এই অভিযানের সংগৃহীত নতুন তথ্য বুধের সংকোচন সম্পর্কিত বিতর্কগুলোর অবসান ঘটাবে।
বুধের পৃষ্ঠজুড়ে থাকা বিশেষ ধরনের ভাঁজ, ফাটল ও খাড়া প্রান্তের গঠন থেকেই গ্রহটির সংকোচনের প্রমাণ পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীরা এসব গঠনকে সংকোচনজনিত কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করেন। কোনো কোনো খাড়া প্রান্ত প্রায় ১ মাইল বা ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার উঁচু এবং কয়েকশ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত।
হিসাব অনুযায়ী, বুধের ব্যাসার্ধের পরিবর্তন প্রায় ৭ দশমিক ২ মাইল বা ১১ দশমিক ৬ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। আগের গবেষণাগুলোতে ব্যাসার্ধের পরিবর্তন ০ দশমিক ৬ থেকে ১ দশমিক ২ মাইল বা ১ থেকে ২ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৪ দশমিক ৩ মাইল বা ৭ কিলোমিটার পর্যন্ত বলে ধারণা করা হয়েছিল।
আপনার মতামত লিখুন :