Facebook Twitter Instagram YouTube

আঙুলের ছাপের অনন্য জ্যামিতিক নকশা ও তার পেছনের বিজ্ঞান


প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১০, ২০২৬, ৮:০৮ অপরাহ্ণ /
আঙুলের ছাপের অনন্য জ্যামিতিক নকশা ও তার পেছনের বিজ্ঞান

মানবদেহের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো আঙুলের ছাপ। এই পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষের বাস হলেও প্রত্যেকের আঙুলের জ্যামিতিক নকশা সম্পূর্ণ আলাদা এবং অদ্বিতীয়। এমনকি যেসব অভিন্ন বা আইডেন্টিক্যাল জমজ (Identical Twins) সন্তানের ডিএনএ প্রায় ৯৯.৯৯ শতাংশ এক থাকে, তাদের আঙুলের ছাপও কখনো এক হয় না। এই অনন্য জ্যামিতিক নকশাটি মূলত মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থাতেই স্থায়ী রূপ লাভ করে।

ভ্রূণের বয়স যখন ১০ থেকে ১৩ সপ্তাহ হয়, তখন তার আঙুলের ত্বকে প্রাথমিক রেখাগুলো তৈরি হতে শুরু করে। এরপর ১৬ থেকে ১৯তম সপ্তাহের মধ্যে এই রেখাগুলোর জ্যামিতিক নকশা স্থায়ী রূপ নেয়। গর্ভাশয়ের ভেতরের অ্যামনিওটিক তরলের প্রবাহ ও চাপ, রক্তনালীর বিন্যাস এবং ভ্রূণের নড়াচড়ার মতো অজস্র পরিবর্তনশীল জৈবিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে এই নকশাটি গড়ে ওঠে। এই সূক্ষ্ম প্রক্রিয়াগুলো এতই ভিন্ন ও বৈচিত্র্যময় হয় যে, একই গর্ভে পাশাপাশি বেড়ে ওঠা জমজ শিশুদের আঙুলের ছাপেও সম্পূর্ণ আলাদা জ্যামিতিক রূপ তৈরি হয়।

জ্যামিতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আঙুলের ছাপে প্রধানত তিনটি মূল নকশা দেখা যায়—লুপ বা বাঁকানো রেখা, আর্চ বা ধনুকের মতো খিলান এবং ওয়ার্ল বা পেঁচানো ঘূর্ণি। আঙুলের ত্বকে থাকা রেখাগুলো যেখানে দ্বিখণ্ডিত হয়, শেষ হয়ে যায় কিংবা বিন্দুর মতো রূপ নেয়, বৈজ্ঞানিক ভাষায় সেই সূক্ষ্ম স্থানগুলোকে বলা হয় 'মিনুশাই' (Minutiae)। একটি আঙুলে এমন ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্ট থাকে। এই বিন্দুগুলোর অবস্থান, কোণ ও পারস্পরিক দূরত্বের যে জটিল জ্যামিতিক হিসাব তৈরি হয়, তা প্রতিটি মানুষের জন্য আলাদা। একবার গর্ভাশয়ে এই নকশা তৈরি হয়ে গেলে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত এটি আর পরিবর্তিত হয় না। আঙুলের উপরিভাগ বা এপিডার্মিস কেটে বা পুড়ে গেলেও সুস্থ হওয়ার পর তা ঠিক আগের নকশাতেই ফিরে আসে। কেবল আঘাত যদি ত্বকের গভীরের ডার্মাল প্যাপিলা স্তর পর্যন্ত পৌঁছায়, তবেই স্থায়ী ক্ষত তৈরি হতে পারে, যা আবার নিজের জায়গায় আরেকটি অনন্য চিহ্ন বহন করে।

আঙুলের ছাপের এই অনন্যতা আবিষ্কার ও তা প্রমাণের পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৮৮০ সালে স্কটিশ চিকিৎসক স্যার হেনরি ফোল্ডস প্রথম বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার'-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে আঙুলের ছাপ দিয়ে অপরাধী ও ব্যক্তি শনাক্তকরণের বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। পরবর্তীতে ১৮৯২ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার ফ্রান্সিস গাল্টন এ বিষয়ে গভীর গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালনা করেন। তিনি 'গাল্টন ডিটেইলস' তত্ত্বের মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, দুটি ভিন্ন মানুষের আঙুলের ছাপ হুবহু এক হওয়ার সম্ভাবনা গাণিতিকভাবে প্রায় অসম্ভব।

১৮৯৭ সালে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশে এই আবিষ্কারকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দেওয়ার জন্য এক যুগান্তকারী গাণিতিক শ্রেণীবদ্ধকরণ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন দুই বাঙালি মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তা কাজী আজিজুল হক এবং হেমচন্দ্র বসু। তাদের তৈরি করা এই গাণিতিক ফর্মুলার ওপর ভিত্তি করেই বিখ্যাত 'হেনরি ক্লাসিফিকেশন সিস্টেম' গড়ে ওঠে, যা বিশ্বজুড়ে আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।

এই অপরিবর্তনশীল ও নিখুঁত জ্যামিতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বায়োমেট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যন্ত সব জায়গায় আঙুলের ছাপকে মানুষের সবচেয়ে সত্য ও নির্ভুল পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। মহাজাগতিক স্কেলে চিন্তা করলে এটি আরও বেশি বিস্ময়কর। একটি আঙুলের ছাপে থাকা মিনুশাই পয়েন্টের অবস্থান ও দূরত্বের সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস বা পারমিউটেশন তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব এক সংখ্যা নির্দেশ করে। ফলে এটি কেবল এই পৃথিবীতেই নয়, বরং পুরো মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার নিয়মেও মানুষের অনন্যতার এক অতুলনীয় গাণিতিক প্রমাণ।

একটি আঙুলের ছাপে থাকা ৫০ থেকে ১৫০টি মিনুশাই পয়েন্টের অবস্থান, দিক ও দূরত্বের সমন্বয়ে যে সম্ভাবনার বিন্যাস (Permutation) তৈরি হয়, তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব এক সংখ্যা নির্দেশ করে।

লেখক : মইনুল রনি, * তথ্যসূত্র : Discover with Mainul

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Bangladesh