
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের (এসএনএসসি) প্রধান হিসেবে মোহসেন রেজায়িকে নিয়োগ দিয়েছে দেশটি। কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত রেজায়ি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র। তিনি মোহাম্মদ বাকার জোলকদরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। জোলকদরকে এখন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা খামেনির রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি সমন্বয়কারী এই পরিষদের চেয়ারম্যান হলেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) যোগ দেন রেজায়ি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৮১ সালে তিনি আইআরজিসির কমান্ডার হন এবং টানা ১৬ বছর এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের অধিকাংশ সময় তিনি আইআরজিসির কমান্ডার ছিলেন। তার নেতৃত্বে বাহিনীর স্থল, নৌ ও বিমান সক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়। তিনি বিপ্লবের সময় গোপন তৎপরতা থেকে উঠে আসা এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া আইআরজিসি কমান্ডারদের প্রজন্মের অন্যতম সদস্য। কিশোর বয়স থেকেই পাহলভি রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় রেজায়ি ১৯৭৩ সালে শাহের নিরাপত্তা সংস্থা সাভাকের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দি হয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৭০-এর দশকে পাহলভি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সক্রিয় সশস্ত্র সংগঠন ‘মানসুরুন’ গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা ও বিকাশেও তিনি ভূমিকা রাখেন।
আইআরজিসির কমান্ডারের পদ ছাড়ার পরও তিনি ইরানের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি একাধিকবার প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হয়েছেন। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির সরকারের সময় তিনি অর্থনৈতিকবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছেন রেজায়ি। গত মার্চে মোজতবা খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর রেজায়িকে সামরিক উপদেষ্টা নিয়োগ করেন।
চলমান যুদ্ধের সময় রেজায়ি নিয়মিত প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি আলোচনার বিষয়ে গভীর সংশয় প্রকাশের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। এপ্রিল মাসে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে স্থল অভিযান শুরু করলে তা “দারুণ” হবে, কারণ তখন ইরান “হাজার হাজার জিম্মি” করতে পারবে এবং “প্রতিটি জিম্মির বিনিময়ে এক বিলিয়ন ডলার” দাবি করতে পারবে। তিনি যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর পক্ষে নন বলেও ব্যক্তিগত মত প্রকাশ করেছিলেন। গত জুনে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করার আগে রেজায়ি বলেছিলেন, ওই চুক্তিতে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। ২৭ জুন তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা সৃষ্টি করে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনেন।
রোববার এক ডিক্রির মাধ্যমে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা তাকে এসএনএসসিতে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন। নিয়োগের কারণ হিসেবে খামেনি রেজায়িয়ের দীর্ঘ সামরিক ক্যারিয়ারসহ তার “মূল্যবান অভিজ্ঞতার” কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ইরান-ইরাক যুদ্ধে রেজায়িয়ের ভূমিকা নিয়ে ইরানে বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকেরা ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে পরিচালিত অপারেশন কারবালা-৪-এর মতো ব্যয়বহুল সামরিক অভিযানে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ২০১৮ সালে কারবালা-৪ নিয়ে একটি পোস্ট করে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেন রেজায়ি। তিনি দাবি করেছিলেন, কারবালা-৫ অভিযানের আগে শত্রুকে বিভ্রান্ত করার জন্য কারবালা-৪ পরিচালনা করা হয়েছিল। পরে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কারবালা-৪ প্রথমে প্রকৃত সামরিক অভিযান হিসেবেই পরিকল্পিত ছিল, তবে ব্যর্থ হওয়ার পর এটিকে বিভ্রান্ত করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তার এই মন্তব্যের পর যুদ্ধের সাবেক সেনা, নিহত সেনাদের পরিবারের সদস্য এবং জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে সমালোচনা আসে।
২৭ বছর বয়সেই রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পরপরই ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে (আইআরজিসি) যোগ দেন রেজায়ি। মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৮১ সালে তিনি আইআরজিসির কমান্ডার হন। টানা ১৬ বছর এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেন তিনি। এর মধ্যে ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের অধিকাংশ সময়ই তিনি আইআরজিসির কমান্ডার ছিলেন।তার নেতৃত্বে আইআরজিসির স্থল, নৌ ও বিমান সক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়। বিপ্লবের সময় গোপন তৎপরতা থেকে উঠে আসা এবং পরবর্তী সময়ে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া আইআরজিসি কমান্ডারদের একটি প্রজন্মের অন্যতম সদস্য রেজায়ি।
আপনার মতামত লিখুন :