
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় চুরি যাওয়া স্বর্ণালংকারের বড় অংশের কোনো হদিস এখনো মেলেনি। পুলিশের ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের পর আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ছয় থেকে সাত ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে যান। তবে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ ভরি ৫ আনা স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি স্বর্ণালংকার কোথায় আছে, তার কোনো তথ্য এখনো তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে নেই।
মামলাটি তদারকির দায়িত্বে থাকা রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপুলিশ কমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানান, আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মাটি খুঁড়ে ওই ১ ভরি ৫ আনা স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়েছে। আসামি সিদ্ধার্থ দাসের পরিবারের কয়েক প্রজন্ম স্বর্ণালংকার তৈরির কারিগরের সঙ্গে যুক্ত। হত্যাকাণ্ডের পরদিন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বাইরে ঘোরাফেরা করেছেন এবং বর্তমানে তাঁরা কারাগারে আছেন। এসব কারণে বাকি স্বর্ণের হদিস পাওয়া বা উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। তবে আসামিদের পরিবারের স্বর্ণ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং বাকি স্বর্ণ উদ্ধার না হওয়ার মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা নিয়ে তিনি সুস্পষ্ট কোনো জবাব দেননি।
হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে পুলিশের বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে রংপুর মহানগর পুলিশের তৎকালীন কমিশনার আবদুল মাবুদ প্রেস ব্রিফিং করে জানিয়েছিলেন, ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে সিঁড়িতে এবং ১২ বছরের ছেলেকে শয়নকক্ষে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশের পক্ষ থেকে ডাকাতির উদ্দেশ্যের কথাও বলা হয়। তবে ডিবির বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী বলছেন, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়া নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে টাকা ও স্বর্ণালংকার চুরি করাই ছিল হত্যাকাণ্ডের মূল লক্ষ্য। আদালতে দেওয়া দুই আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ও জেলগেটে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চুরির বিষয়টি সামনে এসেছে।
তদন্তে আরও জানা গেছে, এলাকায় প্রচার ছিল যে গণপতি চক্রবর্তী অবসরকালীন ব্যাংক থেকে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা তুলে বাড়িতে রেখেছেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে ডিবি পুলিশ এখন দাবি করছে, গণপতি চক্রবর্তীর বিভিন্ন ব্যাংকের তিন-চারটি অ্যাকাউন্ট যাচাই করে দেখা গেছে, তিনি হত্যাকাণ্ডের আগে ব্যাংক থেকে কোনো টাকা তোলেননি।
ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তা জিন্নাত আলীর ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ প্রথমে বাড়ির বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। পরে পাশের নির্মাণাধীন ভবনের সিঁড়ি দিয়ে ছাদে প্রবেশ করেন। ভোররাতে শব্দ পেয়ে গণপতি ছাদে গেলে তাঁকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে সিঁড়িতে এবং ১২ বছরের ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীকে শয়নকক্ষে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পরও আসামিরা কিছু সময় বাড়িতে ছিলেন; তাঁরা গোসল করেন, খেজুর ও শসা খান এবং তিনটি আলমারি তছনছ করে ১৫ হাজার টাকা ও ছয়-সাত ভরি স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যান। ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে, তবে এখনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। গত ২১ আগস্ট মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং প্রতিবেশী সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করা হয়। আসামিদের ডোপ টেস্ট করার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :