
মিয়ানমারের গহিন জঙ্গলে অবস্থানরত গণতন্ত্রকামী ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স’ (পিডিএফ)-এর যোদ্ধারা এখন এক দীর্ঘমেয়াদি ও অনিশ্চিত লড়াইয়ের মুখোমুখি। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে এ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। পর্যবেক্ষণ সংস্থা এসিএলইডির তথ্যমতে, ২০২৩ সালে তাদের একটি যৌথ অভিযানে বিদ্রোহীরা মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের দোরগোড়ায় পৌঁছে গিয়েছিল। তবে জান্তা সরকার আবার রণক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে।
সাফাইং অঞ্চলের একটি গোপন প্রশিক্ষণ ঘাঁটিতে কর্মরত ২৩ বছর বয়সী এক পিডিএফ সেকশন কমান্ডার, যিনি নিরাপত্তার স্বার্থে নিজের নাম প্রকাশ না করে ‘ভিলেন’ পরিচয় দিয়েছেন, জানান যে বিপ্লবের তেজ এখন অনেকটাই কমে এসেছে। নতুন করে যোগ দেওয়া যোদ্ধাদের মধ্যেও এই আন্দোলনের সফলতা নিয়ে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা দানা বাঁধছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে বেইজিংয়ের সক্রিয় ভূমিকা স্পষ্ট। চীন কেবল জান্তার নতুন বেসামরিক প্রশাসনকে সমর্থনই দিচ্ছে না, বরং পিডিএফের সঙ্গে জোটবদ্ধ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর সাথে যুদ্ধবিরতি করিয়ে দিতেও মধ্যস্থতা করেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি (এমএনডিএএ) এবং তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ)-এর মতো শক্তিশালী জাতিগত গোষ্ঠীর সঙ্গে জান্তার যুদ্ধবিরতি চুক্তি বিদ্রোহী শিবিরে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। শক্তিশালী মিত্রদের হারিয়ে এখন পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও অস্ত্রের অভাবে পিডিএফ যোদ্ধারা পিছু হটছেন। ফলে জান্তা বাহিনী থাইল্যান্ড ও চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথগুলো পুনরায় নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক মর্গান মাইকেলসের মতে, পিডিএফ যোদ্ধারা বর্তমানে জান্তা বাহিনীর কাছে বড় কোনো কৌশলগত হুমকি নয়। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন ছাড়া এসব অসংগঠিত বাহিনী হয় যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হবে, নয়তো তারা আঞ্চলিক যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত হবে অথবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
রাজনৈতিকভাবেও জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং শক্তিশালী অবস্থানে ফিরছেন। গত এপ্রিলে বেসামরিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ভারত, লাওস ও চীনে লালগালিচা সংবর্ধনা পেয়েছেন। যদিও বিরোধীরা একে প্রহসন হিসেবে দেখছে, তবুও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই কূটনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে জান্তার উদ্যোগকে এক ধরনের ‘পথ’ হিসেবে দেখছে।
নির্বাসিত ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন মার অং স্বীকার করেছেন যে জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন হারানো তাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। আগামী রোববার ব্যাংককে তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ১১ জাতির আসিয়ান জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতায় হতাশ হয়েই জান্তার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, রণক্ষেত্রে ঐক্য ও শক্তি প্রমাণ করতে পারলে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি আবারও পরিবর্তিত হতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :