Facebook Twitter Instagram YouTube

হরমুজ প্রণালি এড়াতে বিকল্প রুট: বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্র


প্রকাশের সময় : জুলাই ২৫, ২০২৬, ৫:২৮ অপরাহ্ণ /
হরমুজ প্রণালি এড়াতে বিকল্প রুট: বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্র

ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ও কেন্দ্রবিন্দুতে বড় পরিবর্তন এসেছে। শুরুতে ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা কিংবা দেশটির পারমাণবিক ও সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় থাকলেও, এখন মূল লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। আন্তর্জাতিক মহলে এখন বড় প্রশ্ন—হরমুজ প্রণালি কি আগের মতোই আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে উন্মুক্ত থাকবে, নাকি ইরান নিজের শর্তে এই পথ ব্যবহারের নিয়ম নির্ধারণ করবে?

ইরান এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি অবরুদ্ধ করেনি। তবে দেশটি ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়ছে এবং যুদ্ধকালেও হরমুজ প্রণালি সচল থাকবে—এমন দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। অথচ ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার ১২ দিনের সংঘাতের সময়েও এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই বাস্তবতাকে বদলে দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা ঠেকানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি সামরিক অভিযান হতে যাচ্ছে। এর আগে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে লোহিত সাগরের বাণিজ্য ব্যাহত করেছিল। তখন ওয়াশিংটন আন্তর্জাতিক জোট গঠন করে বিমান হামলা চালিয়েও প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ থামাতে পারেনি কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর আস্থা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পরই হুতিরা হামলা বন্ধ করেছিল। এবার হরমুজের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

বিশ্বের মোট জাহাজ চলাচলের প্রায় ১০ শতাংশ হয় বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পও ইরানের সঙ্গে একটি স্বল্পস্থায়ী সমঝোতা ঘোষণার আগে সতর্ক করেছিলেন যে, হরমুজে বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। মূলত বৈশ্বিক জ্বালানির দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপের মুখে ফেলাই ইরানের কৌশল, যাতে ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব মেনে নিতে বাধ্য হয়। যদি ইরান এই জলপথের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবে তারা প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ট্রানজিট ফি আদায়ের পাশাপাশি বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই কৌশল উল্টো ইরানের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং জ্বালানি কোম্পানিগুলো এখন এমন পাইপলাইন, বন্দর ও পরিবহন করিডোর নির্মাণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, যাতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি করা যায়। এই উদ্যোগগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। এই পথের ওপর নির্ভরশীল ছিল ইরাক, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনের রপ্তানি। পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই রুট ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন দেশ বিকল্প রপ্তানি পথ তৈরির পরিকল্পনা করছে। বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকসের এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের শেষ নাগাদ বর্তমানে হরমুজ দিয়ে যে পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, বিকল্প রুটগুলোর মাধ্যমে তার প্রায় ৬০ শতাংশ বহনের সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় হরমুজে উত্তেজনার অভিজ্ঞতা থেকে সৌদি আরব বহু বছর আগে পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন নির্মাণ করেছিল। বর্তমান সংকটে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি সম্ভব হয়েছে। এখন সৌদি সরকার এই পাইপলাইন আরও সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে, যা ২০২৯ সালের মধ্যে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ লাখ ব্যারেল পরিবহনের সক্ষমতা যুক্ত করবে। ফলে মোট সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রতিদিন প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল। এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতেরও হরমুজের দক্ষিণে একটি পাইপলাইন রয়েছে, যা বর্তমানে প্রতিদিন ১৮ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করতে পারে। ২০২৭ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা দ্বিগুণ করে ৩৬ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

পাশাপাশি ইরাকের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি হোয়াইট হাউসে সফর করে সিরিয়ার সহযোগিতায় নতুন পাইপলাইন পুনর্নির্মাণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। কিরকুক থেকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেইহান পর্যন্ত বিদ্যমান পাইপলাইন পুনরায় সক্রিয় করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইরাক জর্ডানের আকাবা বন্দর পর্যন্ত নতুন পাইপলাইন নির্মাণের কাজও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।

ইতিহাসের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষণে ২০০৬ সালে চালু হওয়া বাকু-তিবলিসি-জেইহান (বিটিসি) পাইপলাইনের কথা বলা হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে নির্মিত এই পাইপলাইন আজারবাইজান, জর্জিয়া ও তুরস্ক হয়ে ভূমধ্যসাগরে তেল পরিবহনের নতুন পথ তৈরি করে এবং রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে ইউরোপ দীর্ঘদিন রাশিয়ার জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা পরবর্তীতে মস্কো রাজনৈতিক চাপ হিসেবে ব্যবহার করে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো ইরানের ক্ষেত্রে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না।

নতুন পাইপলাইন নির্মাণে অর্থায়ন, নিরাপত্তা ও নির্মাণ বিলম্বসহ নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও সামগ্রিক প্রবণতা স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন ধরে নিচ্ছে যে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি সবসময় নির্ভরযোগ্যভাবে খোলা থাকবে—এমন নিশ্চয়তা আর নেই। ফলে তারা একাধিক বিকল্প রপ্তানি পথ গড়ে তুলতে চায়। ইরানের বর্তমান কৌশল এই ধারণার ওপর নির্ভর করছে যে বিশ্বের সামনে হরমুজ প্রণালির কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু যদি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বিকল্প পাইপলাইন ও রপ্তানি করিডোর সফলভাবে গড়ে তুলতে পারে, তবে ভবিষ্যতে হরমুজের কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। সে ক্ষেত্রে ইরান যে ভূরাজনৈতিক প্রভাব অর্জন করতে চায়, শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলই তার প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin