Facebook Twitter Instagram YouTube

জুলাই বিপ্লবের বয়ান ও বাস্তবতা: ইতিহাসের দায় ও আগামীর পথ


প্রকাশের সময় : আগস্ট ৬, ২০২৬, ৮:০৩ পূর্বাহ্ণ /
জুলাই বিপ্লবের বয়ান ও বাস্তবতা: ইতিহাসের দায় ও আগামীর পথ

রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি বয়ানেরও লড়াই। ইতালীয় চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসির মতে, শাসকশ্রেণি কেবল রাষ্ট্রযন্ত্র দিয়ে নয়, বরং মানুষের ভাবনার জগত দখল করে এবং ইতিহাসের একচেটিয়া ব্যাখ্যা চাপিয়ে শাসন বজায় রাখে। বিগত ফ্যাসিবাদী জমানায় বাংলাদেশ এর জ্বলন্ত সাক্ষী। মুক্তিযুদ্ধের মতো জাতীয় গৌরবকে একটি দল, পরিবার বা ব্যক্তির তালুক বানিয়ে ফেলা হয়েছিল। সেই আরোপিত বয়ানের আড়ালেই গুম, খুন, আয়নাঘর এবং ভোটাধিকার হরণের মতো ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ভিন্নমতকে ‘রাজাকার’ তকমা দিয়ে দমন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের মহাকাব্যিক গণঅভ্যুত্থান ছিল সেই নিপীড়ক বয়ানের বিরুদ্ধে জনগণের চূড়ান্ত রায়। আজ এই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে জাতির সামনে মৌলিক জিজ্ঞাসা—আমরা কি জুলাইয়ের নিজস্ব বয়ান নির্মাণ করতে পেরেছি এবং সেই বয়ানের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব কতখানি?

ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১ এবং ১৯৯০-এর গণজাগরণেরই সর্বশেষ ও সম্ভবত সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। প্রতিটি জাগরণের পর একটি অভিন্ন ট্র্যাজেডি জাতিকে তাড়া করেছে—রক্ত দিয়েছে জনগণ, কিন্তু ফসল ঘরে তুলেছে সুবিধাবাদীরা। মার্কিন ইতিহাসবিদ ক্রেন ব্রিনটন তার ‘অ্যানাটমি অব রেভল্যুশন’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, বিপ্লবের ‘থার্মিডর’ পর্বে বিপ্লবের সন্তানরা পরস্পরকে গ্রাস করে এবং পুরোনো শক্তি নতুন লেবাসে ফিরে আসে। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা তিন জোটের রূপরেখায় বন্দি থাকার খেসারত জাতি দিয়েছে ভয়াবহ ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে। জুলাই সেই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি হবে কি না, সেটিই আজকের মীমাংসার বিষয়।

জুলাই অভ্যুত্থান নিছক সরকার পতনের আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল বৈষম্য, দুঃশাসন, লুটপাটতন্ত্র ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জাতীয় জাগরণ। আবু সাঈদের প্রসারিত বুক কিংবা মুগ্ধর ‘পানি লাগবে, পানি’—এসব কেবল আবেগ নয়, নতুন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাচিহ্ন। জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের হিসাবে প্রায় দেড় হাজার শহীদ, অগণিত আহত, চোখহারা ও পঙ্গু তরুণের আত্মদানের বিনিময়ে ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদের পতন ঘটে। এই বয়ান কোনো তাত্ত্বিকের টেবিলে নয়, বরং রাজপথে, দেয়ালে গ্রাফিতিতে এবং তরুণ প্রজন্মের স্লোগানে রচিত হয়েছে। এই ইশতেহারের মর্মবাণী ছিল বৈষম্যের অবসান, ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন এবং জাতীয় মর্যাদার সুরক্ষা।

দুই বছরের ব্যবধানে দাঁড়িয়ে সৎ আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি—শহীদের আকাঙ্ক্ষা কতটা পূরণ হলো? অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর জাতিকে যেমন আশান্বিত করেছে, তেমনি ক্লান্তও করেছে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশের স্তূপ জমেছে, জুলাই সনদ নিয়ে দীর্ঘ দরকষাকষি হয়েছে, কিন্তু ক্ষমতার ভারসাম্য ও জবাবদিহির মৌলিক প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ মীমাংসা এখনো হয়নি। তবে ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে দেড় দশক পর জনগণ তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে—যেখানে মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে প্রতিনিধি বেছে নিয়েছে। এই অর্জন খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। জনগণের রায়ে জাতীয়তাবাদী শক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট পেয়েছে। ১৭ বছর জেল-জুলুম, গুম-খুন ও মিথ্যা মামলার পাহাড় ডিঙিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে আপসহীনতার দৃষ্টান্ত রেখেছেন, তা এই ম্যান্ডেটের নৈতিক ভিত্তি রচনা করেছে।

ক্ষমতাসীনদের শীর্ষজনের সদিচ্ছার উজ্জ্বল আলামত জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। বিজয়ের রাতেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘প্রতিহিংসা নয়, প্রতিদান; প্রতিশোধ নয়, রাষ্ট্র মেরামত’—এই বার্তা দিয়েছেন। তিনি আইনের শাসনের বাইরে এক পা-ও হাঁটেননি। রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফায় দ্বিকক্ষের আইনসভা, ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অভ্যুত্থানের তরুণ নেতৃত্বকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশীদার করার প্রয়াস শহীদ জিয়ার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের দর্শনেরই উত্তরাধিকার। গুম-খুনের বিচারের আইনি কাঠামো চূড়ান্ত হওয়া এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর কূটনৈতিক তৎপরতাও সদিচ্ছার প্রমাণ।

তবে রাজনীতির নির্মম পাঠ হলো, শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছাই শেষ কথা নয়। সদিচ্ছা ও বাস্তবায়নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে মরচে ধরা আমলাতন্ত্র, সুবিধাবাদীদের ভিড় ও চাটুকারের বেষ্টনী। তৃণমূলে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর ‘জিরো টলারেন্স’-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফ্যাসিবাদ কেবল ব্যক্তির নাম নয়, এটি একটি ব্যবস্থা; যার শিকড় এখনো প্রশাসনে, অর্থনীতিতে ও সংস্কৃতির অঙ্গনে রয়ে গেছে। সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এখনো দিল্লির দিকে তাকিয়ে জুলাইকে ‘ষড়যন্ত্র’ বা ‘বিদেশি চক্রান্ত’ বলে প্রতি-বয়ানের চেষ্টা করছে। এই প্রতি-বয়ানের জবাব দিতে হবে ইতিহাসের নির্মোহ দলিল, পাঠ্যপুস্তক, গবেষণা ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

জুলাইয়ের বয়ান নিয়ে ঘরের ভেতরের সংকটও কম নয়। কেউ কেউ একে নিজেদের একক কৃতিত্ব বলে দাবি করছেন, আবার কেউ প্রতিপক্ষকে খাটো করতে অভ্যুত্থানকে ‘নিছক ক্ষমতার পালাবদল’ বলে নাকচ করছেন। অথচ জুলাই কারো তালুক নয়; এটি ছাত্র-জনতা, মাদরাসার তালিবে ইলম, শ্রমিক, রিকশাচালক ও গৃহিণীদের যৌথ রক্ত ও অশ্রুর ফসল। প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে যে ‘মব’ সংস্কৃতির বাড়াবাড়ি দেখা গিয়েছিল, পতিত শক্তি আজ সেগুলোকে অস্ত্র বানিয়ে অভ্যুত্থানকে কলঙ্কিত করতে চাইছে। আইনের শাসনের প্রতিটি ব্যত্যয় জুলাইয়ের বয়ানে কালিমা লেপন করে।

বিপ্লবের বয়ান শুধু স্লোগানে নয়, ভাতের থালায়ও টিকে থাকে। রুটি-রুজির প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না এলে মহত্তম বয়ানও ম্লান হয়ে যায়। ভূরাজনীতির ক্ষেত্রেও সীমান্ত হত্যা, পানির ন্যায্য হিস্যা ও বাণিজ্য ভারসাম্যের প্রশ্নে নতজানু হওয়ার অবকাশ নেই। জুলাই ছিল অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদের পাশাপাশি বহিরাগত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় আত্মমর্যাদার ঘোষণা। বিপ্লব ব্যর্থ হয়নি, বরং এটি এখন তৃতীয় ও কঠিনতম ধাপ—প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হান্টিংটনের মতে, রাজনৈতিক রূপান্তরের আসল পরীক্ষা ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হাতবদলের ধারাবাহিকতায়। বিপ্লবীদের বিভাজনই প্রতিবিপ্লবের প্রধান পুঁজি। তাই শহীদের আমানত রক্ষায় বিভেদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আলবেয়ার কামুর ভাষায়, বিপ্লবীরা শেষ পর্যন্ত নিপীড়কে পরিণত হতে পারে অথবা স্বপ্নচ্যুত হতে পারে। জুলাইয়ের কুশীলবদের সামনে তৃতীয় পথ খোলা আছে—শহীদদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। আবু সাঈদরা পদপদবির জন্য বুক পেতে দেয়নি, তারা চেয়েছিল এমন এক রাষ্ট্র যেখানে বন্দুক নয়, ব্যালটই হবে ক্ষমতার উৎস। সেই বাংলাদেশ এখনো নির্মাণাধীন, আর এই দায় আমাদের জীবিতদেরই পালন করতে হবে।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh