
শিশু বয়সে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার ভয়াবহ ও ট্রমাটিক অভিজ্ঞতাগুলো সকলের সামনে তুলে ধরতে ‘আওয়াজ ডট বিডি’ (https://awaz.bd/) নামে একটি নতুন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে এটি চালু হওয়ার পর মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ৪৫ জন ভুক্তভোগী তাঁদের শৈশবের নিপীড়নের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। মূলত ছেলেশিশুদের নিপীড়নের ঘটনাগুলো সামনে নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে এই সাইটটি তৈরি করা হলেও, মেয়েরাও এতে তাঁদের ছোটবেলার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেছেন।
প্ল্যাটফর্মটিতে জমা পড়া ৪৫টি অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই পুরুষ। ৭ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ৬৩ শতাংশ জানিয়েছেন যে তাঁদের সঙ্গে একাধিকবার এমন ঘটনা ঘটেছে এবং ৩৮ শতাংশ দীর্ঘ মেয়াদে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, যেখানে প্রথমে জোরপূর্বক এবং পরে ভয় দেখিয়ে তাঁদের চুপ রাখা হয়েছিল।
পরিসংখ্যানে নিপীড়কদের পরিচয়ও উঠে এসেছে। ছেলেদের ক্ষেত্রে ৩২ শতাংশ পরিচিত ব্যক্তি, ২৬ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৬ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং ১০ শতাংশ দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের মাধ্যমে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে, মেয়েদের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ পরিচিত, ১৪ শতাংশ বিশ্বস্ত পরিচিত, ১৪ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং ৪৩ শতাংশ দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের দ্বারা নিপীড়িত হয়েছেন। প্রতি পাঁচজন ভুক্তভোগী শিশুর মধ্যে একজন পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমেই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
নিপীড়নের ৫৬ শতাংশ ঘটনাই ঘটেছে বাড়িতে, যার মধ্যে ৫৪ শতাংশ নিজের বাড়িতে, ১৯ শতাংশ অভিযুক্তের বাড়িতে এবং ১৫ শতাংশ আত্মীয়ের বাসায় ঘটেছে। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন ৩৬ শতাংশ ভুক্তভোগী। ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৫৬ শতাংশ কওমি মাদ্রাসায় এবং ১৯ শতাংশ স্কুলে এই ঘটনাগুলো ঘটেছে। বাকি ঘটনাগুলো মসজিদ, আলিয়া মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেছে।
এই প্ল্যাটফর্মটি গড়ে তোলার পেছনে কাজ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও অনলাইন উদ্যোক্তা রাকিবুল হাসান (২৭) এবং কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এমফিলের গবেষক সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর (৪২)। রাকিবুল হাসান জানান, ছেলেশিশু ধর্ষণ, বিশেষ করে মাদ্রাসার ঘটনাগুলো সামনে আসার পর তাঁরা এই উদ্যোগ নেন। ‘ঘুষ’ নামক একটি সাইট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা এটি তৈরি করেন, যাতে শিশু নিপীড়নের ঘটনাগুলো নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সামাজিক চাপ তৈরি করতে পারে। এটি কোনো আইনি সহায়তা কেন্দ্র বা হেল্প সেন্টার নয়, বরং একটি সচেতনতা তৈরির প্ল্যাটফর্ম। কওমি মাদ্রাসার প্রাক্তন শিক্ষার্থী রাকিবুল চান সরকার ও মাদ্রাসা বোর্ডগুলো যেন এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
প্ল্যাটফর্মটিতে প্রবেশ করলেই স্ক্রিনে ‘আওয়াজ উঠাও’ স্লোগান ভেসে ওঠে। সেখানে লেখা রয়েছে, ‘আপনার নীরবতা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়, আপনার তথ্য অপরাধ দমনে সহায়তা করে’। ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা রক্ষায় এখানে কোনো নাম, ছবি বা পরিচয় নেওয়া হয় না। এমনকি কোনো কুকি বা ট্র্যাকিং করা হয় না এবং কোনো তথ্যও সংরক্ষণ করা হয় না।
সাইটটিতে ভুক্তভোগীরা তাঁদের ট্রমা শেয়ার করেছেন। একজন পুরুষ লিখেছেন, শৈশবে নিজের বাড়িতেই আপন চাচাতো ভাইয়ের কাছে বারবার বলাৎকারের শিকার হয়েছেন তিনি। এক নারী লিখেছেন, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পড়াতে আসা মামাতো ভাই তাঁকে রুমে নিয়ে নিপীড়ন করেছিলেন, যা মনে পড়লে আজও তাঁর গা শিউরে ওঠে। আরেকজন কওমি মাদ্রাসার প্রাক্তন ছাত্র লিখেছেন, জ্বরের ঘোরে ঘুমানোর সময় বড় এক ছাত্রের দ্বারা নিগ্রহের শিকার হন তিনি। কিন্ডারগার্টেনের আরেকজন ভুক্তভোগী লিখেছেন, শিক্ষকের কাছে রাতে পড়তে গিয়ে বড় ক্লাসের এক ছেলের নিপীড়নের শিকার হন, যার ট্রমা তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। কেউ কেউ লিখেছেন, শৈশবের এই বীভৎস অভিজ্ঞতা তাঁদের পরবর্তী সময়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করেছে।
‘শিশুরাই সব’ সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার এ বিষয়ে বলেন, শৈশবের যৌন নির্যাতন শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে, যা তাদের প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের স্বাভাবিক সম্পর্কগুলোকেও বাধাগ্রস্ত করে। তিনি শিশুদের ‘খারাপ স্পর্শ’ ও ‘ভালো স্পর্শ’ সম্পর্কে সচেতন করার এবং ভয়হীনভাবে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ তৈরির তাগিদ দেন। শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়নকে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচনা করে সরকারকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আপনার মতামত লিখুন :