
বাংলাদেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ ২০ বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) জানিয়েছে, সাধারণ জ্বর-কাশি ও তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ১৩ শতাংশই ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত। একই পর্যবেক্ষণে দেশে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গবেষণায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) কারিগরি সহায়তা প্রদান করেছে।
আইইডিসিআরের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষকেরা এই তথ্য তুলে ধরেন। এতে আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ বলেন, ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। তিনি গণমাধ্যমকে ইনফ্লুয়েঞ্জা সচেতনতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ, জেলা হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
আইইডিসিআরের সহযোগী অধ্যাপক মোনালিসা জানান, ২০১৯ সালে দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। এছাড়া ২০১১-১২ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে ১৬ হাজার ৮০৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্বে ১৩৮টি দেশে ১৫৭টি ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সেন্টারের মধ্যে আইইডিসিআর একটি।
১৫টি সরকারি ও একটি বেসরকারি হাসপাতালে গত দুই দশকে ১ লাখ ৭২ হাজার ৭৯২ জন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ২২ হাজার ২৮৪ জনের ইনফ্লুয়েঞ্জা শনাক্ত হয়েছে। পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জার হার বেশি হলেও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। এই গবেষণায় ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, সাতক্ষীরা, নরসিংদী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজার, জয়পুরহাট, পটুয়াখালী জেলা হাসপাতাল, যশোর ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সিলেটের জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সাধারণত শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা হয় বলে ধারণা করা হলেও, আইসিডিডিআরবির সহযোগী বিজ্ঞানী ফাহমিদা চৌধুরী জানান, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর হলো ইনফ্লুয়েঞ্জার মৌসুম এবং জুন-জুলাই মাসে এর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকে। স্বাস্থ্যকর্মী, গর্ভবতী নারী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত এবং ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিদের ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকি বেশি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। টিকা দেওয়ার বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন যে, মৌসুম শুরুর এক মাস আগে, অর্থাৎ মার্চ মাসে টিকা দেওয়া সবচেয়ে যৌক্তিক। তবে সব মানুষকে টিকা দেওয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে সেমিনারে বিভিন্ন মত উঠে এসেছে।
সেমিনারে উপস্থিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব শেখ মোমেনা মনি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক সৈয়দা জেসমিন সুলতানা এবং সিডিসি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন হাবিব হাসপাতালে অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
একই পর্যবেক্ষণ বলছে, দেশে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর উপস্থিতি উদ্বেগজনক।২০০৭ সাল থেকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
আপনার মতামত লিখুন :