Facebook Twitter Instagram YouTube

হরমুজ-সুয়েজের বিকল্প? আর্কটিকের ‘বরফ সিল্ক রোডে’ নজর চীনের


প্রকাশের সময় : আগস্ট ১৭, ২০২৬, ৭:৫২ অপরাহ্ণ /
হরমুজ-সুয়েজের বিকল্প? আর্কটিকের ‘বরফ সিল্ক রোডে’ নজর চীনের

হরমুজ প্রণালি ও সুয়েজ খালের মতো ঐতিহ্যবাহী বৈশ্বিক বাণিজ্যপথগুলো যখন ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন নতুন বিকল্প হিসেবে উত্তর মেরুর ‘নর্দার্ন সি রুট’ বা উত্তর সাগরপথের দিকে ঝুঁকছে চীন। রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে আর্কটিক মহাসাগরের বরফাচ্ছাদিত জলপথ দিয়ে ইতোমধ্যে নিয়মিত বাণিজ্যিক কনটেইনার পরিবহন শুরু করেছে বেইজিং। তবে ‘বরফ সিল্ক রোড’ নামে পরিচিত প্রায় ৫,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পথটি জলবায়ু পরিবর্তন, রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে কতটা বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

চীনা শিপিং প্রতিষ্ঠান ‘সি লিজেন্ড’ সম্প্রতি এই আর্কটিক রুটে নিয়মিত কনটেইনার সেবা চালু করেছে। ২০২৫ সালে পরীক্ষামূলকভাবে যাত্রা শুরু করার পর, এবার তারা চীনের নিংবো-ঝৌশান বন্দর থেকে সরাসরি যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এই পথে পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগছে মাত্র ১৮ দিন, যেখানে সুয়েজ খাল হয়ে এই দূরত্ব পাড়ি দিতে ৪০ দিনেরও বেশি সময় লেগে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাশ্রয়ী সময়ের কারণে বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য দ্রুত পরিবহনে এই পথ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, যেগুলোর বৈশ্বিক রপ্তানিতে চীন নেতৃত্ব দিচ্ছে।

আর্কটিক অঞ্চলে চীনের এই আগ্রহ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ২০১৭ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে আর্কটিক নৌপথের উন্নয়ন ঘটিয়ে একটি ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। শুরুতে বেইজিংয়ের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি নিয়ে রাশিয়ার কিছুটা সতর্কতা থাকলেও, ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক আগ্রাসনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে মস্কো অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে বেইজিংয়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যা আর্কটিকে চীনের প্রভাব ও প্রবেশাধিকার বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। উল্লেখ্য, এই বাণিজ্যপথের একটি বড় অংশ রাশিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ‘রোসাটম’ এই পথে নৌচলাচলের অনুমতি ও পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে বরফ ভেঙে জাহাজ এগিয়ে নেওয়ার জন্য রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকারের প্রয়োজন হয়।

এদিকে, পথ ছোট হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ প্রায় অর্ধেক কমে যাবে বলে ‘সি লিজেন্ড’ দাবি করলেও পরিবেশবিদরা এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে ভারী জ্বালানি তেল বা হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও) ব্যবহারের বিষয়টি বড় দুশ্চিন্তার কারণ। ২০২৪ সালে আর্কটিকে এই জ্বালানি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হলেও কিছু জাহাজ তা অমান্য করছে বলে সমালোচনা রয়েছে। অত্যন্ত ঘন এই জ্বালানি তেল দুর্ঘটনাবশত ছড়িয়ে পড়লে প্রচণ্ড ঠান্ডায় তা সহজে নষ্ট হয় না এবং বরফের নিচে আটকে গেলে অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া দুর্গম অঞ্চল হওয়ায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। পাশাপাশি, ভারী জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ‘ব্ল্যাক কার্বন’ বা কালো কার্বন বরফের ওপর জমে সূর্যের তাপ বেশি শোষণ করে, যা বরফ গলার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

নর্দার্ন সি রুটে আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া নৌবহর। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত যথাযথ বীমাহীন ও তদারকিহীন এসব রুশ তেলবাহী ট্যাংকার পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলোনা’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা প্রায় ১০০টি জাহাজ এই পথে চলাচল করেছে, যা ছিল সে বছর রুটটিতে যাতায়াত করা মোট কার্গো জাহাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ২০২৬ সালে গ্রীষ্মের তীব্র উষ্ণতার কারণে এই পথে নৌচলাচল আরও বৃদ্ধি পায়। সম্প্রতি মে মাসেই একটি রুশ এলএনজি পরিবাহী জাহাজ এই পথে যাত্রা শুরু করে এবং গত সপ্তাহে উত্তর মেরুর ৫০০ মাইলের মধ্যে দিয়ে প্রায় ৮০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী একটি বিশাল রুশ জাহাজের বহর চলাচল করতে দেখা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের কারণে হরমুজ ও সুয়েজ খালের ওপর বৈশ্বিক বাণিজ্যের নির্ভরতা কমানোর তাগিদ বাড়ছে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও এই নর্দার্ন সি রুটকে বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাময় পথ হিসেবে তুলে ধরছেন। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এবং কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা এই রুটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফ গলে নতুন পথ উন্মুক্ত হলেও, পরিবেশগত বিপর্যয় ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে নর্দার্ন সি রুটকে এখনই হরমুজ বা সুয়েজ খালের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার সময় আসেনি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Adin