Facebook Twitter Instagram YouTube

খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিকের ছড়াছড়ি: জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি


প্রকাশের সময় : আগস্ট ২, ২০২৬, ৮:০৪ পূর্বাহ্ণ /
খাদ্যে ভেজাল ও রাসায়নিকের ছড়াছড়ি: জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি

সকালের নাশতায় এক কাপ চায়ের সঙ্গে পাউরুটি খাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি দৃশ্য। কিন্তু সেই পাউরুটি যদি ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানে তৈরি হয়, তবে তা মৃত্যুসহ নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে শিশুদের খাবার থেকে শুরু করে তেল, মসলা, দুধ, ফল ও শাকসবজিসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। মুনাফার লোভে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী শিল্পজাত রাসায়নিক, ক্ষতিকর রং ও নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করছে, যা জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্ট্রোক ও ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগে প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি, লবণ, চর্বি এবং ভেজালযুক্ত খাদ্য গ্রহণ এসব মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বিএসটিআই ১ হাজার ৭৫৬টি খাদ্যনমুনা পরীক্ষা করেছে। এর মধ্যে ৩৩.৪ শতাংশ বা ৫৮৬টি নমুনায় ভেজাল বা দূষণ পাওয়া গেছে। পরীক্ষায় পটাশিয়াম অ্যালুমিনিয়াম সালফেট, সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট, ভারী ধাতু, কীটনাশক ও নিষিদ্ধ ডিডিটির মতো ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। আচার, সস, চিপস, মুড়ি, ফলের রস, শিশুখাদ্য, গুঁড়া হলুদ, ঘি, সরিষার তেল ও মধুসহ বিভিন্ন পণ্যে এসব অনিয়ম ধরা পড়েছে। এমনকি চালের নমুনায় আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম এবং লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০ থেকে ৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে।

বাজারে নকল ও ভেজাল পণ্য রোধে বিএফএসএ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআই নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও পরিস্থিতির বিশেষ উন্নতি নেই। সম্প্রতি ক্ষতিকর প্রিজারভেটিভ ব্যবহারের দায়ে ইস্ট কেক ইন্টারন্যাশনাল ফুড, ইস্ট জিবাই ইন্টারন্যাশনাল এবং আরবোটিং ফুড কোম্পানির নির্দিষ্ট কিছু কেক ও পাউরুটি বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড কোয়েকার, হেলথ প্যারাডাইস ও কাউহেডের মোড়কে ভেজাল ওটস বিক্রির চক্রও সক্রিয় রয়েছে। রায়েরবাগ, চকবাজার, মৌলভীবাজার, কেরানীগঞ্জ, ডেমরা ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় এসব ভেজাল পণ্য উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

অভিযান পরিচালনার পরও ভেজাল কেন কমছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কনজ্যুমার এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এস এম নাজের আহমেদ জানান, জরিমানার পরিমাণ অপরাধের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য এবং বড় ধরনের শাস্তির নজির কম হওয়ায় ব্যবসায়ীরা অভিযানের তোয়াক্কা করছে না। বিএসটিআই’র পরিচালক (প্রশাসন) মো. সাইফুল ইসলাম স্বীকার করেছেন যে, লোকবল সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছে না, তবে তারা নিয়মিত বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করছেন। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহবুব কবির মিলন মনে করেন, বিএফএসএ-কে স্বাধীন ও ক্ষমতাসম্পন্ন করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যথায় এ সমস্যা সমাধান করা কঠিন।

বারডেম জেনারেল হাসপাতালের প্রধান নিউট্রোলোজিস্ট শামসুন নাহার মহুয়া সুস্থ থাকতে ঘরোয়া ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বাহিরের প্রক্রিয়াজাত খাবারের পরিবর্তে বাড়িতে তৈরি খাবারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Manab Zamin