Facebook Twitter Instagram YouTube

ইসলামি জীবনদর্শনে শিশুর লালন-পালন ও অভিভাবকত্বের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা


প্রকাশের সময় : আগস্ট ৭, ২০২৬, ১১:০০ পূর্বাহ্ণ /
ইসলামি জীবনদর্শনে শিশুর লালন-পালন ও অভিভাবকত্বের ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে শিশুকে কেবল পরিবারের সদস্য নয়, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মা-বাবার কাছে অর্পিত এক পবিত্র আমানত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে সন্তানকে পিতা-মাতার জন্য দুনিয়ার শোভা ও পরীক্ষার মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই শিশুর শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক বিকাশের দায়িত্ব পালন কেবল আবেগের বিষয় নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ইসলাম স্নেহ, ভালোবাসা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে, পাশাপাশি প্রয়োজনে ন্যায়সংগত শাসনেরও অনুমোদন দেয়।

মহানবী (সা.) ছিলেন শিশুদের প্রতি দয়া ও সহনশীলতার সর্বোত্তম আদর্শ। তিনি শিশুদের ভালোবাসতেন, কোলে তুলে নিতেন এবং তাদের সঙ্গে হাসিমুখে আন্তরিক আচরণ করতেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি পথ চলতে শিশুদের আগে সালাম দিতেন। তার নাতি হাসান-হোসাইনকে চুম্বন করতে দেখে এক সাহাবি অবাক হলে রাসুল (সা.) বলেছিলেন, ‘যার অন্তরে দয়া নেই, তার প্রতিও দয়া দেখানো হয় না।’ এমনকি নামাজরত অবস্থায় নাতনি উম্মে কুলসুমকে কাঁধে নিয়ে সালাত আদায়ের ঘটনাও তার কোমলতার প্রমাণ দেয়। তিরমিজি শরীফের ১৯২১ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের ছোটদের স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’

শিশুরা স্বভাবগতভাবেই চঞ্চল ও কৌতূহলী। তারা ভুল করবে এবং তা থেকে শিখবে—এটাই স্বাভাবিক বিকাশের ধারা। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, শিশুর ভুলকে শাস্তির চোখে না দেখে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। ভয়ের পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশু আত্মবিশ্বাসহীন ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই প্রতিটি ভুলের জবাবে কঠোর না হয়ে বরং ধৈর্য, বোঝানো ও উৎসাহ দেওয়ার নির্দেশ দেয় ইসলাম।

তবে ইসলাম শাসনের প্রয়োজনীয়তাকেও অস্বীকার করে না। সন্তানকে দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সময়মতো শিক্ষা ও সংশোধন অপরিহার্য। এ প্রসঙ্গে আবু দাউদ শরীফের ৪৯৫ নম্বর হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং দশ বছর বয়সে নামাজ না পড়লে তাদের শাসন করো।’ এই হাদিসের উদ্দেশ্য নির্যাতন নয়, বরং দীর্ঘসময় শিক্ষা ও উৎসাহ দেওয়ার পরও প্রয়োজনে সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইসলামি বিশেষজ্ঞরা শাসনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রথমে নরম ভাষায় উপদেশ, এরপর মৃদু তিরস্কার এবং শেষ পর্যায়ে প্রয়োজনে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এমন কোনো শাসনের অনুমতি নেই যা কষ্টদায়ক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিকর। মুখমণ্ডল বা শরীরের সংবেদনশীল অংশে আঘাত করা, রাগের বশে প্রহার করা কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফিকহবিদরা শারীরিক শাস্তির মাত্রা ও স্থানের ওপর সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করেছেন, যাতে তা প্রতিহিংসামূলক না হয়ে শিক্ষামূলক থাকে।

শিশুর ওপর জুলুম করা মারাত্মক গুনাহ, কারণ এটি বান্দার হকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অভিভাবক বা শিক্ষকের প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূলে থাকতে হবে সন্তানের কল্যাণ ও সঠিক পথে পরিচালনার আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা। আজকের সমাজে শিশুদের মানসিক সুস্থতা ও নৈতিক বিকাশ নিশ্চিত করতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণই একমাত্র পথ। স্নেহ হবে শিক্ষার ভিত্তি, আর শাসন হবে প্রজ্ঞা ও সংশোধনের মাধ্যম—শাস্তি বা প্রতিশোধের হাতিয়ার নয়।

কন্টেন্ট: সংগৃহীত | সূত্র: Daily Amar Desh