
‘স্ব-অবলম্বন’ শব্দ থেকেই ‘স্বাবলম্বন’ শব্দের উৎপত্তি। মানুষ যে মাটিতে আছাড় খায়, সেই মাটি আঁকড়ে ধরেই আবার উঠে দাঁড়ায়—এটাই স্বাবলম্বনের সহজ প্রকাশ। একজন স্বাবলম্বী ব্যক্তি নিজের মেধা, যোগ্যতা এবং মহামূল্যবান মস্তিষ্কের ওপর আস্থা রাখেন। তিনি অলৌকিক কোনো সাহায্যের আশায় বসে থাকেন না, বরং নিজের দায়িত্ব নিজে গ্রহণ করেন এবং আশপাশের দায়িত্বও নিজের কাঁধে তুলে নেন। শূন্য থেকে শুরু করলেও ধাপে ধাপে তার কাজ পূর্ণতা পায়। ইসলামে এই স্বাবলম্বিতা বা আত্মনির্ভরশীলতাকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়; এটি কেবল জাগতিক বিষয় নয়, বরং ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।
স্বাবলম্বী জীবনই প্রকৃত সফল জীবন। যারা নিজের বিছানা গোছানো, সময়মতো ঘুম থেকে ওঠা বা নিজের ছোটখাটো কাজ নিজে করতে পারে না, তারা জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে থাকে। অথচ পৃথিবীর অন্যতম সফল মানুষ রাসুলুল্লাহ (সা.) শৈশব থেকেই ছিলেন স্বাবলম্বী। যিনি শৈশবেই বাবা-মা ও দাদাকে হারিয়ে চাচার আশ্রয়ে বড় হয়েছেন, সেই এতিম বালক নিজেই মরুভূমিতে মেষ চরানোর মতো পরিশ্রমসাধ্য কাজ বেছে নিয়েছিলেন। তরুণ বয়সে মরুভূমির তৃষ্ণা ও যাত্রার কষ্ট সহ্য করেও তিনি বাণিজ্যে সফল হয়েছেন। ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মাণের সময়ও তিনি সবার সঙ্গে মাটি বহন করেছেন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তার এই সফলতার মূলে ছিল নিজের দায়িত্ব নিজে নেওয়ার অদম্য আগ্রহ।
ইসলামে দুনিয়া ও পরকাল—উভয় কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে মহান আল্লাহ বান্দাকে শিক্ষা দিয়েছেন, ‘হে আমাদের রব! আমাদের দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং পরকালেও কল্যাণ দিন’ (সুরা বাকারা : ২০১)। দুনিয়াবি কল্যাণের জন্য সম্পদে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার তাগিদ রয়েছে। ইসলামে যেমন কৃপণতা নিষিদ্ধ, তেমনি প্রাচুর্যের সময় অপচয় করাও নিষেধ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না। আল্লাহ অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না’ (সুরা আরাফ : ৩২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ মুত্তাকি, আত্মনির্ভরশীল ও লোকালয় থেকে নির্জনে বাসকারী বান্দাকে ভালোবাসেন’ (মুসলিম : ৭৩২২)।
সাদ ইবনে মালেক (রা.)-এর বর্ণনায় পাওয়া যায়, বিদায় হজের বছর তিনি যখন মৃত্যুর মুখোমুখি, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে উপদেশ দিয়েছিলেন যে, সন্তানকে নিঃস্ব রেখে যাওয়ার চেয়ে সম্পদ রেখে যাওয়া উত্তম, যাতে তারা অন্যের কাছে ভিক্ষা করতে বাধ্য না হয় (বোখারি : ৩৯৩৬)। হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘ওপরের হাত (দাতার হাত) নিচের হাত (গ্রহীতার হাত) থেকে উত্তম।’ যে ব্যক্তি পরমুখাপেক্ষিতা থেকে বাঁচতে চায়, আল্লাহ তাকে স্বাবলম্বী করে দেন (বোখারি : ১৪২৭)।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্বাবলম্বনের মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর, তাই কৃষিকে উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অসম্ভব। ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব দূর করতে চাকরির মোহ ত্যাগ করে শিক্ষিত যুবকেরা এখন কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে মনোযোগী হচ্ছেন। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা কেবল স্বাবলম্বীই হচ্ছেন না, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছেন। গ্রামীণ শিক্ষিত যুবকদের এই আত্মনিবেদন এবং কৃষিক্ষেত্রে তাদের অবাধ যোগদান বাংলাদেশকে ভবিষ্যতে উন্নত দেশের মর্যাদা দিতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :