
চুরি ও অনিয়মের অভিযোগে বৈশ্বিক জার্নাল থেকে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তালিকায় নাম রয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) সাবেক উপাচার্য মো. আবদুল মজিদের। তিনি বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিউটিক্যাল কেমিস্ট্রি বিভাগের অধ্যাপক। ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি যবিপ্রবির চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় আট মাস আগে, ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হিন্দাউই থেকে তাঁর দুটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়। তিনি এই দুটি গবেষণাপত্রের সহলেখক ছিলেন।
প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্র দুটির মধ্যে একটিতে দেশে উৎপাদিত শজনে বীজের নির্যাসের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণ নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। অন্য গবেষণাপত্রটিতে সেলুলোজভিত্তিক বিশেষ ন্যানোকম্পোজিট ব্যবহার করে ক্ষতিকর উপাদান দূর করা এবং জৈব অণু সুরক্ষায় এর কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা ছিল।
হিন্দাউইয়ের তদন্তে গবেষণাপত্র দুটিতে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্যমতে, গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় বাস্তব পরীক্ষা না চালিয়েই গবেষণার তথ্য ও ফলাফল তৈরি করা হয়েছিল। এসব তথ্যের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এছাড়া গবেষণাপত্র দুটি ‘পেপার মিল’-এর মাধ্যমে তৈরি বা কেনা হয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে। পেপার মিল বলতে এমন একটি চক্রকে বোঝায়, যারা অর্থের বিনিময়ে গবেষণাপত্র তৈরি, বিক্রি বা প্রকাশের ব্যবস্থা করে।
হিন্দাউই আরও জানিয়েছে, গবেষণাপত্র যাচাইয়ের আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউ প্রক্রিয়ায় ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের আগে সংশ্লিষ্ট লেখকদের বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তাদের পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যা সন্তোষজনক ছিল না। এ বিষয়ে অধ্যাপক আবদুল মজিদ জানান, তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়নি এবং তিনি গবেষণায় শুধু আইডিয়া শেয়ারের কাজে যুক্ত ছিলেন।
এদিকে ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত যবিপ্রবির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নাম থাকা ১০টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরপর গত মে মাসে আরও একটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম থাকা প্রত্যাহার হওয়া গবেষণাপত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টি। গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়া গবেষকদের তালিকায় বুয়েট, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাম রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রত্যাহারের এসব ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক আবদুল মজিদ বলেন, তিনি দু-একটি গবেষণা প্রত্যাহারের কথা শুনেছিলেন, তবে যাদের এই সমস্যা ছিল, তাদের গবেষণার জন্য পুরস্কার দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেননি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সানডিয়েগোর গবেষক নাদিম মাহমুদ বলেন, গবেষণায় চুরি ও অনিয়ম পশ্চিমা দেশে নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখা হয় এবং এর জন্য একাডেমিক শাস্তির মুখে পড়তে হয়, যা বাংলাদেশে এখনো চালু হয়নি।
অন্য গবেষণায় সেলুলোজভিত্তিক বিশেষ ন্যানোকম্পোজিট ব্যবহার করে ক্ষতিকর উপাদান দূর করা এবং জৈব অণু সুরক্ষায় এর কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়।‘চুরি ও অনিয়ম ধরা পড়ায় প্রত্যাহার বাংলাদেশিদের ৩২৫ গবেষণাপত্র’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন গতকাল শনিবার প্রকাশ করে প্রথম আলো।
এতে ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন সময়ে প্রত্যাহার হওয়া অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্রের তথ্য তুলে ধরা হয়, যেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন গবেষকের সংযুক্তি রয়েছে।.২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর যবিপ্রবির চতুর্থ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান আবদুল মজিদ।
আপনার মতামত লিখুন :