
চালের দানার মতো দেখতে অতি ক্ষুদ্র একটি সামুদ্রিক প্রাণী এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ‘কস্টাসিয়েলা কুরোশিমাই’ বা ‘লিফ শিপ’ নামে পরিচিত এই সামুদ্রিক স্লাগটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান আয়োজিত ‘বছরের সেরা অমেরুদণ্ডী প্রাণী’ প্রতিযোগিতায় বিশ্বব্যাপী পাঠকদের ভোটে বিজয়ী হয়েছে। মাত্র কয়েক মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রাণীটি খালি চোখে দেখা বেশ কঠিন। এর মাথার ওপর থাকা দুটি সংবেদনশীল অঙ্গ অনেকটা ভেড়ার কানের মতো দেখায়, আর শরীরের ওপর সবুজ পাতার মতো গঠনের কারণেই এর এমন নামকরণ হয়েছে।
জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের উষ্ণমণ্ডলীয় সমুদ্রের পানিতে বাস করা এই প্রাণীটি ১৯৯৩ সালে প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছিল। ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির কল্যাণে পরবর্তীতে এটি সামুদ্রিক প্রাণীপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। এই প্রাণীর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘সোলার প্যানেল’-এর মতো কাজ করার ক্ষমতা। এটি প্রাণী হয়েও উদ্ভিদের মতো সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন করতে পারে। তবে এটি নিজে কোনো উদ্ভিদীয় অঙ্গ তৈরি করে না, বরং শৈবাল খাওয়ার সময় সেখান থেকে সবুজ ক্লোরোপ্লাস্ট নিজের শরীরে জমা করে রাখে। ‘ক্লেপ্টোপ্লাস্টি’ নামক এই প্রক্রিয়ায় শৈবাল থেকে নেওয়া ক্লোরোপ্লাস্টগুলো প্রাণীর শরীরে কার্যকর থাকে এবং সূর্যের আলো ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনে সাহায্য করে। অবশ্য এর মানে এই নয় যে প্রাণীটি শুধু সূর্যের আলোতেই বেঁচে থাকে; শৈবাল খাওয়া তার জীবনধারণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। শরীরে ধরে রাখা ক্লোরোপ্লাস্ট তাকে অতিরিক্ত শক্তির উৎস ব্যবহারের সুযোগ দেয়।
এ বছরের প্রতিযোগিতায় দশটি অসাধারণ অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে চূড়ান্ত লড়াই হয়েছিল। হাজার হাজার মনোনয়ন থেকে ১০টি প্রাণীকে চূড়ান্ত তালিকায় নেওয়া হয়েছিল। ২০ আগস্ট বিজয়ী হিসেবে লিফ শিপের নাম ঘোষণা করা হয়। এই প্রতিযোগিতায় প্যাটাগোনিয়ার বিশাল বাম্বলবি বম্বাস ডালবোমি দ্বিতীয় এবং প্রাচীন নীল রক্তের ঘোড়ার খুর কাঁকড়া তৃতীয় স্থান অধিকার করে।
বিশ্বে পরিচিত প্রায় ১৭ লাখ প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী রয়েছে। পোকামাকড়, সামুদ্রিক স্লাগ, কাঁকড়া ও কেঁচোসহ এসব প্রাণী পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেক সময় মানুষের আগ্রহের বাইরে থেকে যায়। গার্ডিয়ানের এই প্রতিযোগিতার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো এসব প্রাণীর গুরুত্ব ও বৈচিত্র্যের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। চালের দানার মতো ছোট এই প্রাণীটি এখন প্রমাণ করছে যে, প্রকৃতিতে শক্তি সংগ্রহ ও টিকে থাকার কৌশল কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে। সূর্যের আলোকে শক্তিতে রূপান্তরের ক্ষমতার কারণে ‘লিফ শিপ’ এখন বিশ্বের আলোচিত ক্ষুদ্র প্রাণীদের একটি।
আপনার মতামত লিখুন :