
তাকওয়া বা আল্লাহভীতি হচ্ছে সকল গুণের সমষ্টি, মুক্তির উপায়, প্রশান্তির চাবিকাঠি এবং ইহকাল ও পরকালের প্রকৃত আশ্রয়স্থল। মানুষের হৃদয়ে অনেক সময় অহংকার বাসা বাঁধে, যা তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়। এই অহংকার মূলত তুলনার ভ্রান্তি থেকে জন্ম নেয়, যখন কেউ নিজেকে অন্যদের চেয়ে বেশি যোগ্য, জ্ঞানী বা মর্যাদাবান মনে করে। যখন কেউ অন্যের রিজিক, পদ বা সম্মানকে তুচ্ছ করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করে, তখন তা প্রকারান্তরে আল্লাহর ন্যায়ের ওপর গোপন আপত্তি এবং তাঁর হিকমতের ওপর সন্দেহ তৈরি করে।
অহংকারের এই বিষয়টি কেবল জিহ্বায় সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা অহংকারী দৃষ্টি, তাচ্ছিল্যের হাসি, অবজ্ঞার ভঙ্গি কিংবা নীরবতার মাধ্যমেও প্রকাশ পায়। বস যখন কর্মচারীকে, ধনী যখন গরিবকে, বা ধার্মিক যখন পাপীকে হীন মনে করে—তখনই অহংকারের প্রকাশ ঘটে। এমনকি ধর্মের নামেও অনেকে মনে করতে পারে যে কেবল তাদের পথই সত্য, আর অন্যরা ভ্রান্ত। কেউ কেউ নসিহত, দাওয়াত বা বিতর্কের আড়ালেও একে লুকায়, কিন্তু আসলে তা সরল অহংকার। ইবলিসের অহংকারের পথ অনুসরণ করা এই মানসিকতা সৃষ্টির মৌলিক হিকমতের পরিপন্থী। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন, 'যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবগত।' (সুরা মুলক : ১৪)।
আল্লাহ যা আমাদের দিয়েছেন, তা আমাদের জন্য কল্যাণকর। মুমিনের উচিত তুলনার বন্দী না হয়ে সন্তুষ্টির পথে চলা। শরিয়ত অহংকার থেকে সতর্ক করার পাশাপাশি ইউসুফ (আ.)-এর মতো সর্বোচ্চ আদর্শ আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। ইউসুফ (আ.) নিজের মর্যাদা বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য কাউকে ছোট করেননি, বরং দায়িত্বশীলতার সাথে নিজেকে একজন বিশ্বস্ত সেবক হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'আমাকে দেশের ধনভাণ্ডারের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করুন; আমি তো উত্তম রক্ষক, সুবিজ্ঞ।' (সুরা ইউসুফ : ৫৫)। তিনি নিজেকে অন্যের সাফল্যের মানদণ্ড বানাননি, বরং একজন বিশ্বস্ত সেবক হিসেবে নিজেকে দেখিয়েছেন।
অহংকার সমাজ ও সম্পর্কের ভিত ভেঙে দেয়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও উন্নয়নের ধারাকে ব্যাহত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'যার অন্তরে সরিষার দানার সমান অহংকারও থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।' (মুসলিম : ১৬৮)। পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ উদ্ধত ও অহংকারীদের পছন্দ করেন না বলে সতর্ক করা হয়েছে (সুরা লুকমান : ১৮)। আবু সাঈদ খুদরি (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয়ী হলে আল্লাহ মর্যাদা বাড়িয়ে দেন, আর অহংকার করলে আল্লাহ তাকে হীনতমে পরিণত করেন (ইবনে মাজাহ : ৪১৭৬)। তাই নিয়ামত চিরস্থায়ী নয় জেনে বিনয়ী হওয়া এবং সবসময় অন্তরকে অহংকার, আত্মপ্রশংসা, কুধারণা ও লোক দেখানো ইবাদত থেকে পবিত্র রাখার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা জরুরি।
আপনার মতামত লিখুন :