
দেশের অধিকাংশ বালুমহাল এখন এক ভয়ংকর ত্রিভুজ সিন্ডিকেটের কবলে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বালু লুটের এই অপরাধচক্রের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। সামনে বিএনপি, পেছনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্র এবং রক্ষাকবচ হিসেবে প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের অদৃশ্য সুরক্ষার চাদরে গড়ে উঠেছে এই অপরাধ সাম্রাজ্য। এমনকি এসব অপকর্ম আড়াল করতে একশ্রেণির সুবিধাভোগী সাংবাদিকও জড়িত বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
নদীর বুক চিরে অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব এবং রাতে ভারী ট্রাকের বিকট শব্দে স্থানীয় মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যমুনা নদীতে বালুমহালের ম্যানেজারকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে গ্রামবাসীকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার মতো ঘটনা প্রমাণ করে বালুমহালগুলো এখন ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের ফলে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, যা পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।
সুনামগঞ্জের যাদুকাটা-২ বালুমহাল (৩৯৮.০৪ একর) ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও আইনের ফাঁক গলে সেখানে এখনো বালু উত্তোলন চলছে। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেট সদস্যরা এখান থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। এই চাঁদাবাজিতে শতাধিক ক্যাডারের একটি বাহিনী কাজ করছে, যাদের মধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিতর্কিত কর্মীরাও রয়েছেন। স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল তালুকদার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন নির্বিঘ্ন রাখতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা, নৌপুলিশ, থানা পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) কোটি কোটি টাকা মাসোহারা দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, যাদুকাটা নদীর বালুমহাল থেকে তাহিরপুরের স্থানীয় অসাধু সাংবাদিকরা প্রতিমাসে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার, জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা ৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং সিলেটে ব্যুরো অফিসের দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন সাংবাদিক মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা পান। এদের মধ্যে তাহিরপুরের ৩ জন প্রভাবশালী সাংবাদিকও রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া ডিও লেটারে জানিয়েছেন, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে যাদুকাটা নদীর তীর কেটে বালু বিক্রি করা হচ্ছে, যা শিমুল বাগান ও স্থানীয় জনপদকে হুমকির মুখে ফেলেছে। পুলিশ ফোর্স মাঝে মাঝে লোকদেখানো অভিযান চালালেও বাস্তবে কোনো সুফল মিলছে না।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল জানিয়েছেন, হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে এবং শুনানি শেষে নিয়ম অনুযায়ী নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে। তবে ইজারাদারদের দাবি ভিন্ন। যাদুকাটা-১ বালুমহালের ইজারাদার নাছির মিয়া জানান, দেশের অন্যান্য বালুমহালের মতো যাদুকাটা থেকেও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। সরকারি নথিতে এপ্রিলের ১৩ তারিখ মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তারা ফেব্রুয়ারিতে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন। এছাড়া ১০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে যাদুকাটা-২ এর ইজারাদার শাহ রুবেল আহমেদ দাবি করেছেন, দখল হস্তান্তর দেরিতে হওয়ায় তাদের মেয়াদ আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বহাল রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :