
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে মক্কায় এক ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান। এই চুক্তির আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র এই তিন প্রভাবশালী সুন্নি মুসলিম দেশ নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
মক্কায় সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় এক বছর ধরে আলোচনার পর এই ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ চূড়ান্ত রূপ পেল। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকে ইরান ও তার মিত্রদের পক্ষ থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করার প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি করা হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে তিন দেশ জানিয়েছে, এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো পারস্পরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করা। তবে চুক্তিতে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দেশ কী ধরনের সামরিক প্রতিশ্রুতি বা সহায়তা দেবে, তা বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। তুরস্কের একজন কর্মকর্তা স্পষ্ট করেছেন যে, এটি সম্পূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক একটি চুক্তি এবং এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়। বিদ্যমান কোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় চুক্তিকে এটি প্রতিস্থাপন করবে না এবং অন্য যেকোনো আঞ্চলিক দেশের জন্য এই জোটে যোগ দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
এই তিন প্রভাবশালী দেশের জোটকে অত্যন্ত শক্তিশালী একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। সৌদিভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ সাগের জানান, মুসলিম বিশ্বের তিনটি বড় শক্তির এই সম্মেলন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিরাপত্তা বিষয়ে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ইচ্ছার প্রকাশ। এই কাঠামোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া গেলে তিন দেশের সম্মিলিত কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। উল্লেখ্য, তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি, সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শক্তিশালী দেশ ও তেল রপ্তানিকারক এবং পাকিস্তান একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রধারী মুসলিম দেশ। তবে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা মূলত ভারতকে কেন্দ্র করে হওয়ায় তা এই চুক্তির অংশ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত তিন বছরের সংঘাত ও হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। ইয়েমেনের হুথি ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের সমন্বিত হামলার আশঙ্কার মুখে রিয়াদ এই নতুন জোট গঠনে জোর দেয়। মক্কায় চুক্তি স্বাক্ষরের আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও শক্তিশালী সেনাপ্রধান আসিম মুনির ওমরাহ পালন করেন। বর্তমানে সৌদিতে পাকিস্তানের প্রায় ৮ হাজার সেনা, যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন রয়েছে। অন্যদিকে ২০২৩ সালে তুরস্কের কাছ থেকে বড় পরিসরে ড্রোন কেনার চুক্তি করেছিল সৌদি আরব। এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় বা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
আপনার মতামত লিখুন :